হাদিস শাস্ত্রে একজন রাবী সাধারন দ্বঈফ হলে বর্তমান আহলে হাদিসগন ফিতনা ছড়াচ্ছে যে, সে হাদিসটির সনদ নাকি অত্যন্ত দুর্বল বলে বিবেচিত হবে, তারা কোন ক্ষেত্রে জাল বা বানােয়াট বলে বেড়িয়ে সমাজে ফিতনা ছড়াচ্ছে। তবে এটির ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিসগন একমত রাবির দুর্বলতা যদি কঠিন পর্যায়ের হয় (যেমন তার ব্যাপারে কোন মুহাদ্দিস যদি মুনকারুল হাদিস,মাতরুকুল হাদিস ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার থাকলে) তাহলে সনদটি দুর্বল তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই রাবীর সামান্ন দুর্বলতায় হাদিসের সনদ জাল বা অত্যন্ত দুর্বল হবে না। এ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে কিছু লিখার জন, প্রয়ােজন মনে করলাম এবং কিছু মুহাদ্দিসের সনদ তাহকীক উদাহরণ স্বরূপ পেশ করলাম।
আল্লামা ইবনে হাযার হাইসামী (র) এক হাদীসের বর্ণনা করতে গিয়ে একজন রাবী দ্বঈফ হওয়ার কথা এভাবে বর্ণনা করেন,
رواه الطبراني، وفيه ابن لهيعة وفيه ضعف، وحديث حسن
-“উক্ত হাদিসে ইবনে লাহিয়া বিদ্যমান। তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী, তারপর হাদিসটি হাসান।"
* আল্লামা ইবনে হাজির হায়সামী : মাযমাউল যাওয়াইদ । ৮/১০২ এবং ১০/১৭০ পূ.
তার বক্তব্য দ্বারা বুঝা গেল একজন রাবী দ্বঈফ হওয়ার কারণেও হাদিসটি নিঃসন্দে হাসান লিগাইরিহী। শুধু তাই নয় নাসিরুদ্দীন আলবানীও উক্ত হাদিসটি সম্পর্কে বলেছেন, ইবনে লাহিয়া দূর্বল রাবী তারপরও বলেন, فالحديث حسنঅত:পর হাদিসটি হাসান" বলে বিবেচিত হবে।
* নাসিরুদ্দীন আলবানী ঃ সিলসিলাতলু আহাদিসুস সহীহাহঃ ৩১৩৬ পৃ.হাদিসঃ১১৪৪
হযরত যাবের (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (দ.) সবাইকে একথাটি জানানাের জন্য বলেছিলেন
لا يدخل الجنة إلا مؤمن»
-“মু'মিন ব্যতিত কেউ জান্নাতে যাবে না। এ হাদিসটি হাইসামী সংকলন করে বলে
رواه أحمد، وفيه ابن لهيعة، وإسناده حسن
হাদিসটি ইমাম আহমাদ বর্ননা করেছেন,আর সনদে ইবনে লাহিয়াহ' রাবি বিদ্যমান তারপরেও হাদিসটি হাসান।”
* আল্লামা ইবনে হাজর হায়সামী ঃ মাযমাউস যাওয়াইদ, ১৫৩, হাদিস:১৬২,ইসলাম ও ঈমান অধ্যায়।
এ ইবনে লাহিয়াহ রাবির হাদিসকে ইবনে হাযার তাঁর এ গ্রন্থের মােট ২৪টি স্থানে অনূরুপ বলেছেন।
* আল্লামা ইবনে হাজর হায়সামী : মাযমাউদ যাওয়াইদ, ৪/১৯৬, হাদিস,৭০০৯, ৫১১৫ হাদিস,৮৪৬৯, ৪/২০পৃ. হাদিস,৫৯৫৪, ৫/২৪৩পৃ. হাদিস,৯২৪২, ৫/২৫৯পৃ. হাদিস, ৯৩২৯, ৫/৩২৫ হাদিস, ১৬৬৪, ৫৩৪০পৃ.হাদিস, ১৭৪৯, ৬৭পৃ. হাদিস,৯৭৭৮, ৬৪২, হাদিস,৯৮৭৬, ৬/৫১. হাদিস, ৯৮৯৯, ৭১পৃ. হাদিস,৯৯৪৭, ৬/৭২পৃ. হাদিস, ১৯৪৮, ১৫৪পৃ. হাদিস,১০২০৯, ৬১৫৫ হাদিস,১০২১১, ১৯০, হাদিস, ১০৩০৩, ৬২১২পৃ. হাদিস, ১০৩৬৭, ৬২৩১, হাদিস,১০৪২৯, ৭৭৭পৃ. হাদিস, ১৯১৯৭, ৭৮পৃ. হাদিস,১১২৫১, ৭/১০০, হাদিস,১১৩১৩, ৭১১৭, হাদিস ১১৩৮৬,৭০০পৃ. হাদিস, ১২৩২৪, ৮/১০২পৃ. হাদিস, ১৩১৯২
শুধু তাই নয় ইমাম আবু ঈসা তিরমিযী (র) এর সুনানে তিরমিযীর ৫ম খন্ডে। কিতাবুল আদাব অধ্যায়ে হযরত যাবের (রা) হতে বর্ণিত আছে
السلام قبل الكلام
-“আগে সালাম তারপর কথাবার্তা।" উক্ত হাদিসটি ইমাম তিরমিযী (র) বর্ণনার করে বলেন উক্ত হাদীসের দুজন রাবী রয়েছেন আম্বাসা ইবনে আব্দুর রহমান দুর্বল এবং মুহাম্মদ ইবনে যাযান মুনকার (পরিত্যক্ত) বর্ণনাকারী। দুইজন রাবী দোষী হওয়ার পরেও হাদীসের ইমামগণ উক্ত হাদিসটি সনদের ব্যাপারে দ্বঈফ বলেছেন।* বুঝা গেল, একজন রাবী মুনকার এবং দুর্বল রাবী হওয়ার পরও উক্ত হাদিসকে শুধু দুর্বল বলেছেন,জাল নয়।
* আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতি : জামেউস সগীর : ২/৩৬১ হাদিস : ৪৮৪২
আল্লামা ইবনে হাযার হাইসামী (র) এক হাদীসের সনদ সম্পর্কে বলেন,
رواه الطبراني في الكبير والأوسط وفيه ابن لهيعة، وفيه ضعف، وحديئة | حسن، وبقية رجاله رجال الصحيح
“উক্ত হাদিসটি ইমাম তাবরানী তার মু'জামুল কবীর ও আওসাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, উক্ত হাদীসে ইবনে লাহিআহ দুর্বল রাবী হলেও হাদিসটি হাসান অর্থাৎ গ্রহণযােগ্য।
* আল্লামা ইবনে হাজর হায়সামী ঃ মাযমাউদ যাওয়াইদ, ৪/১৯৬;৭০০৯
শুধু তাই নয়, আল্লামা ইমাম ইবনে যওজী (র) তার جامع المساندএকটি হাদিস উল্লেখ করে বলেন
هو الصحيح لغيره ” اسناد لضعف ابن لهيعة .
সহিহ -“ইমাম ইবনে যওজী (র) বলেন, উক্ত হাদিসটি صحيح لغيره "সহীহ লিগাইরিহী' (সহিহ লি জাতিহী নয় তার কারণ) উক্ত হাদীসে একজন দুর্বল রাবী ইবনে লাহিআহ রয়েছে।"
* আল্লামা ইমাম ইবনে জওজী : জামিউল মাসানিদ ২১৩৩, হাদিস : ১১২৩
যেমন প্রসিদ্ধ একটি হাদিস রয়েছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ ফরমান :
لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم زائرات القبور، والمخذين عليها المساجد والسرج
-“আল্লাহ কবর জিয়ারতকারীনী মহিলাদের উপর অভিসম্পাত করেন।"
উক্ত হাদিসটি ইমাম তিরমিযী, নাসায়ী, হাকিম, ইমাম আবু দাউদ (র) বর্ণনা। করেছেন। উক্ত হাদীসের একজন রাবী আবু ছালেহ বাযাম তার সম্পর্কে ইমাম ইবনে মাহদী (র) বলেন, তার হাদিস পরিত্যাগযােগ্য।
ইমাম আবু আহমদ (র) ও ইমাম নাসায়ী বলেন,ليس بالقوى অর্থাৎ তিনি শক্তিশালী রাবী নয়, অনুরূপভাবে ইমাম যাহাবী ও বলেছেন। অথচ ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
* আল্লামা ইমাম যাহাবী : মিযানুল ইতিদাল : ৪/৫৩৮ : রাবী নংঃ ১০৩০২
আল্লামা হাইসামী (র) একটি হাদিসের সনদ সম্পর্কে বলেন
رواه أحمد، ورجاله رجال الصحيح غير ابن لهيعة وهو حسن الحديث وفيه ضعف.
-“উক্ত হাদিসটি ইমাম আহমদ বর্ণনা করেছেন, উক্ত হাদিসের সমস্ত রাবী বিশ্বস্ত শুধু “ইবনে লাহিআহ" ব্যতীত,কেননা তিনি দুর্বল রাবি। তাই উক্ত হাদিসটি “হাসান" পর্যায়ের।
* ইবনে হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াহিদ : ৬/২৯৫ পৃ হাদিসঃ১০৭৬১
দেখুন ইবনে লাহি'আহ (র) হলেন একজন দুর্বল রাবী। তারপরও হাদিসটি দুর্বল বলেন নি।
তিনি অন্যস্থানে উক্ত দুর্বল রাবী সম্পর্কে লিখেন
رواه أحمد، ورجاله رجال الصحيح خلا ابن لهيعة، وحديث حسن.
-“উক্ত হাদিসটি ইমাম আহমদ (র) বর্ণনা করেছেন, উক্ত হাদিসের সমস্ত রাৰ সহিহ বা বিশুদ্ধ শুধুমাত্র ইবনে লাহি'আহ ছাড়া। তবে তার হাদিসটি হাসান পর্যায
* ইবনে
হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াইদ : ৪/৩৩৬ পূ।
তিনি অন্যস্থানে উক্ত রাবী সম্পর্কে বলেন
ما رواه الطبراني، وفيه ابن لهيعة، وحديث حسن، وبقية رجاله رجال الصحيح
“উক্ত হাদিসটি ইমাম তাবরানী সংকলন করেছেন, উক্ত সনদে ইবনে লাহিত বিদ্যমান, তারপরও তার কারণে হাদিসটি হাসান”। আর বাকী রাবীগুলাে সহিত, বিশুদ্ধ।
* ইবনে হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াইদ : ৪/৩৫ পৃ.
শুধু তাই নয়, তিনি অন্যত্র হুবহু বলেন
رواه البزار، وفيه ابن لهيعة، وحديئة حسن، وبقية رجاله رجال الصحيح
-“উক্ত হাদিসটি ইমাম বাযযার (র) বর্ণনা করেছেন, উক্ত সনদে ইবনে লাহি'আহ রয়েছে, তারপরও তার সনদটি “হাসান", আর বাকী সকল রাবী বিশুদ্ধ।
* ইবনে হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াইদ : ৪/৩২৯ পৃ.
আল্লামা হাইসামী অন্যস্থানে অন্য রাবী সম্পর্কে লিখেন
رواه أحمد، وفيه محمد بن عمرو بن علقمة وحديث حسن وفيه ضغف لتوء حفظه، وبقية رجاله رجال الصحيح.
-“হাদিসটি ইমাম আবু ইয়ালা (র) ও ইমাম তাবরানী (র) বর্ণনা করেছেন, উক্ত সনদে সমালােচিত রাবী মুহাম্মদ বিন আমর বিন আলকামা রয়েছেন, তারপরও হাদিসটি হাসান"। আর বাকী সমস্ত রাবী সিকাহ বা বিশ্বস্ত।"
* ইবনে হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াইদ ৭/১৪২ পৃ ১১৫১৭
ইমাম হাইসামী এ রাবির ব্যাপারে অনূরুপ তার এ গ্রন্থের ১৮ স্থানে বলেছেন।
* ইবনে হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াইদ : ১২২১, হাদিস,১১১৮, ৪/৩১৬ সি, ৭৩, ৪/৩২৩, হাদিস,১৮১৩,
৩৩, হাদিস, ২০ পিস,১০৩, ২৭, হাদিস-১০১, ৭১৪২পৃ. হাদিস,১১৫১৭, ৮/১০১, হাদিস,১৩১৮
১৩৮. হাদিস,১০১৫৫, ৩২১৮ ৮/২৮, হাদিস,১৩৮৬, ২২৫, হাদিস, ১৫৭৮৫, ৯২২৭, হাদিস,১৫২৮৬, ১৪১৮। হাদিস,১৬১৮২, ১০/০৮পিস,৮৭০১, ১০/১৮, হাদিস, ১৮৫২
তিনি অন্যস্থানে অন্য এক রাবী সম্পর্কে লিখেন
رواه أحمد، وفيه علي بن زيد، وفيه ضعف، وبيقة حسن
-“উক্ত হাদিসটি ইমাম আহমদ সংকলন করেছেন, উক্ত সনদে “আলী বিন যিয়াদ রয়েছেন, আর তিনি দুর্বল, তারপরও হাদিসটি হাসান"।
* ইবনে হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াইদ ৪/৩২২ ..
আল্লামা ইবনে হাযার হাইসামী এক হাদিস প্রসঙ্গে বলেন,
رواه الطبراني، ورجاله رجال الصحيح غير ابن لهيعة، وهو حسن الحديث
হাদিস টি তাবরানি বর্ণনা করেছেন। হাদীসের সকল রাবি বিশ্বস্ত, ইবনে লাহিআহ ব্যতীত। তবুও হাদীস টি হাসান।
* ইবনে
হাজার হায়সামী : মাযমাউদ-যাওয়াইদ১০/১৫৯ পৃ,হাদিস
,১৭২৭২)
তিনি অনুরুপ নিম্নের আরেকটি হাদিস প্রসঙ্গে বলেন,
ما رواه الطبراني وقال: الهباط بالرومية: صاحب الجيش. ورجاله رجال الصحيح غير ابن لهيعة، وهو من الحديث.
-“হাদিসের সমস্ত রাবি বিশ্বস্ত, শুধু ইবনে লাহি'আহ ব্যতিত। তারপরেও হাদিসটি হাসান।" * মাযমাউদ যাওয়াইদ,১০/১৭০পৃ.হাদিস:১৭৩৪৭
* মাযমাউদ যাওয়াইদ,১০/১৭০পৃ.হাদিস:১৭৩৪৭শুধু তাই নয় প্রসিদ্ধ একটি হাদিস হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (দ) ইরশাদ করেন
أولى الناس بي يوم القيامة أكثرهم علي صلاة.
-“রাসূল (দ) ইরশাদ করেন : কিয়ামতের ময়দানে আমার সবচেয়ে নিকট থাকবে সেই ব্যক্তি যে আমার প্রতি অধিক দুরূদ শরীফ পাঠ করবে।”
উক্ত হাদীসে পাকটি ইমাম তিরমিযী ইমাম ইবনে হিব্বান (র) বর্ণন করেছেন। উক্ত হাদীসে একজন রাবী ‘মুসাবিন ইয়াকুব জামাঈ আল মাদানী' সম্পর্কে ইমাম নাসায়ী (র) বলেন, উক্ত রাবী ليس بالقوى শক্তিশালী রাবী নয়।
তারপরও ইমাম তিরমিযী (র) উক্ত হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।তাই প্রমাণিত হলাে একজন রাবী সাধারণত দুর্বল হলে হাদিস 'হাসান' বা গ্রহণযােগ্য।
* ইমাম তিরমিযী : আস সুনান : ১২৪১; হাদিস : ৪৮৪
* ইমাম যাহাবী : মিযানুল ইতিদাল : ২০১কাৰী : ১৪৪০'... -
* আল্লামা ইমাম সাখাভী : মাকাসিদুল হাসানা ঃ ১৬০ পৃঃ হদিস।
* আল্লামা ইমাম আবলুনী : কাশফুল খাফা : ১২৩১; হাদিস : ৫
সুতরাং তার বক্তব্য দ্বারা বুঝা গেল একজন রাবি দ্বঈফ হওয়াতে হাদিসের স দ্বঈফ হওয়া শর্ত নয় তবে রাবির ব্যাপারে যদি মুহাদ্দিসগন বেশী দুর্বলতার শব্দ । ইঙ্গিত করে যেমন মুনকার, বাতিল, মাতরুক হলে নিশ্চয় দ্বঈফ হবে।
সূত্র, প্রমানিত হাদীস কে জাল বানানোর স্বরুপ উন্মোচন
মুফতি মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাহাদুর