আস্সসালামু আলাইকুম
ওয়া রহমাতুল্লাহ্
ﺑِﺴﻢِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟﺮَّﺣﻤٰﻦِ ﺍﻟﺮَّﺣﻴﻢِ
দ্য সোওর্ড অফ আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’য়ালা
সাহাবীয়ে রাসূল সাইফুল্লাহ {রাঃ}-এর নামে মিথ্যা-কুৎসারটন
াকারীগণ হুশিয়ার, সাবধান!!!!! তোমরা যে ঘটনাগুলো বিকৃত করেছ তার সত্য ঘটনা হাদীস থেকে বর্ণিত রেফারেন্স সহ দেয়া হল দেখে নাও, এখনও সময় আছে আল্লাহর লা’নত থেকে নিজেদের বাঁচাও
নাম : আবু সুলাইমান খালীদ।
লকব : “সাইফুল্লাহ” (আল্লাহর তরবারি)।
পিতা : ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা এবং
মাতা : লুবাবা আস-সুগরা, উম্মুল মু’মিনীন খাতুন মাইমুনা বিনতুল হারিস {রাঃ} ও হযরত আব্বাস বিন আবদিল মুত্তালিব {রাঃ}-এর স্ত্রী লুবাবা আল-কুবরা’র বোন।
রাসূল {ﷺ}-এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক : প্রিয় রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} ও হযরত আব্বাস {রাঃ} তাঁর খালু।-[উসুদুল গাবা-২/৯৩)]
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর খান্দান ছিল জাহিলী আরবের কুরাইশদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত। কুব্বা ও আয়িন্না (সৈন্য ও সেনা ক্যাম্পের পরিচালন দায়িত্ব)–এ দু’টি দায়িত্ব ছিল তাঁর খান্দানের ওপর। ইসলামের অভ্যুদয়ের সময় খালীদ {রাঃ} ছিলেন এই পদে অধিষ্ঠিত।-[রেফারেন্স : আল-ইসতিয়াব-১/১৫৭]
হুদাইবীয়ার সন্ধির প্রাক্কালে মুসলমানদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য কুরাইশদের যে দলটি মাক্কাহ্ থেকে বের হয়েছিল, তার নেতা ছিলেন খালীদ। উহুদ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েন এবং মাক্কার মুশরিক বাহিনীর সুনিশ্চিত পরাজয়কে বিজয়ে রূপদান করেন।
হযরত খালীদ ইসলাম গ্রহণের সময় সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তবে মাক্কাহ্ বিজয়ের ৪ মাস পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি আছে।
হযরত আমর ইবনুল আস {রাঃ} কুরাইশদেরকে ‘হাবশা’য় যাবার কথা বলে গোপনে মাদীনায় চলেছেন ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে। পথে মাদীনা অভিমুখী আরেকটি কাফিলার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। তারাও চলেছেন একই উদ্দেশ্যে মাদীনায়। দ্বিতীয় এই দলটির সাথে ছিলেন হযরত খালীদ। আমর ইবনুল আস খালীদকে জিজ্ঞেস করলেন,—“কোন দিকে?” খালীদ জবাব দিলেন,—“আল্লাহর কসম, আমার নিশ্চিত বিশ্বাস এ ব্যক্তি {ﷺ} একজন নবী– আর কতদিন এভাবে চলবে চলো যাই ইসলাম গ্রহণ করি।”-[রেফারেন্স : আল-ইসাবা-১/৪১৩, মুসনাদে আহমাদ]
তারা মাদীনায় রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর খিদমাতে হাজির হলেন। প্রথমে খালীদ, তারপর আমর ইবনুল আস রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর হাতে বাইয়াত করেন। আমর মাক্কায় ফিরে আসেন; কিন্তু খালীদ মাদীনায় থেকে যান।
হযরত খালীদ {রাঃ} বলেন,—“আমার ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} আমাকে বলেছিলেন,—“তোমার মধ্যে বুদ্ধির ছাপ দেখেছিলাম, আমার আশা ছিল এ বুদ্ধি শেষ পর্যন্ত তোমাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের কাছেই সমর্পন করবে।” খালীদ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর হাতে বাইয়াত করার সময় বলেছিলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}! আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে যত পাপ আমি করেছি তা ক্ষমার জন্য আপনি দু’আ করুন। রাসূল {ﷺ} বলেছিলেন,—“ইসলাম অতীতের সকল গুনাহ-খাতা নিশ্চিহ্ন করে দেয়।” আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}! এ কথার ওপরই আমি বাইয়াত করলাম। তিনি {ﷺ } বললেন,—“হে আল্লাহ, তোমার পথে বাধা সৃষ্টি করে যত অপরাধ সে করেছে, তুমি তা ক্ষমা করে দাও।”-[রেফারেন্
স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৪-৮৫]
ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} তাঁর ইসলাম— পূর্ব খান্দানী সামরিক পদে বহাল রেখে তাঁর খিদমাত গ্রহণ করেন।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৩]
মাক্কাহ্ বিজয়কালে তিনি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর সঙ্গী ছিলেন। রাসূল {ﷺ} মুসলিম বাহিনীর দক্ষিণ ভাগের দায়িত্ব তাঁকে দেন। বিনা রক্তপাতে মাক্কাহ্ বিজয় হলেও খালীদ {রাঃ}-এর হাতে সেদিন কতিপয় মুশরিক প্রাণ হারায়। তিনি “কুদার” দিক দিয়ে মাক্কায় ঢুকছিলেন, পথে মাক্কার একটি মুশরিক দলের মুখোমুখি হন। মুশরিকরা তীর নিক্ষেপ শুরু করে। তিনি তীর ছুঁড়ে তাদের জবাব দেন। এরপর মুখোমুখি সংঘর্ষে কয়েকজন মুশরিক নিহত হয়। এজন্য তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর নিকট জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু রাসূল {ﷺ } যখন জানলেন, মুশরিকরাই প্রথম আক্রমণ চালিয়াছে এবং বিনা অপরাধে তারা দু’জন সাহাবী {রাঃ}-কে শাহীদ করেছে তখন তিনি এটাকে আল্লাহর ইচ্ছা হিসাবে মেনে নিয়ে চুপ করে যান।
জাহিলী আরবের কুরাইশদের মূর্তি পূজার কেন্দ্রসমূহের একটি ছিল ‘উযযা’। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ } হযরত খালীদ {রাঃ}-কে পাঠালেন কেন্দ্রটি ধ্বংসের জন্য। তিনি সেখানে পৌঁছে নিম্নের পংক্তিটি আবৃতি করতে করতে কেন্দ্রটি মাটিতে মিশিয়ে দেনঃ “ওহে উযযা,
তুমি পবিত্র নও,
আমরা তোমার অস্বীকার করি,
আমি দেখেছি,
আল্লাহ তোমায় অপমানিত করেছেন।”-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৪]
ইসলাম পূর্ব জীবনে তিনি ছিলেন মুসলমানদের চরম দুশমন, আর ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের দুশমনদের জন্য হয়ে দাঁড়ান ভীষণ বিপদজ্জনক। অসংখ্য যুদ্ধে তাঁর তরবারী মুরতাদ-ইহুদী-মুশরিক-খ্রিষ্টানদের ঐক্য ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত খালীদ {রাঃ} সর্বপ্রথম ‘মূ’তা’ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} দাওয়াতী কার্যক্রমের আওতায় হযরত হারিস বিন উমাইর আযাদী {রাঃ}-কে একটি পত্রসহ ‘বসরা’র শাসকের নিকট পাঠান। শুরাহবীল বিন আমর গাসসানী মূ’তা নামক স্থানে হযরত হারিস {রাঃ}-কে হত্যা করে।
এ ঘটনার প্রতিশোধকল্পে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} হযরত যায়িদ বিন হারিসা {রাঃ}-এর নেতৃত্বে দু’হাজার সৈন্যের এক বাহিনী পাঠান। প্রতিপক্ষ রোমান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল দু’লাখ। আমার নাবী {ﷺ } যে গায়িবের খবরদানকারী এখানেই প্রমাণ দেখুন, যায়িদ বিন হারিসা {রাঃ}-এর বাহিনী মাদীনা থেকে যাত্রার পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} তাঁদের উপদেশ দেন,—“যুদ্ধে যায়িদ যদি শাহীদ হয় তাহলে জা’ফার এবং জা’ফার শাহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বাহিনীর নেতৃত্ব দেবে। আর যদি আবদুল্লাহও শহীদ হয় তাহলে তোমরা তোমাদের কাউকে আমীর বানিয়ে নেবে।”
তাঁরা ছিলেন তিনজন— রাসূল {ﷺ}-এর পালক পুত্র হযরত যায়িদ {রাঃ}, হযরত আলী {রাঃ}-এর ভাই হযরত জা’ফার {রাঃ} ও হযরত আবদুল্লাহ {রাঃ}। তাঁরা সিরিয়ার মূ’তা অভিযানের তিন বীর। এ অসম যুদ্ধে তাঁরা নজীরবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একে-একে শাহাদাত বরণ করেন। অবশেষে হযরত খালীদ {রাঃ} নেতৃত্ব লাভ করেন। একের পর এক তিনজন সেনাপতির শাহাদাত বরণে মুসলিম বাহিনী একদম সাহস হারিয়ে ফেলে এবং হতাশা-উৎকণ্ঠায় অবস্থা খুবই চরম ও নাজেহাল হয়ে যায়। হযরত খালীদ {রাঃ} শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে না পারলেও অতুলনীয় রণকৌশলে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করেন।
হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ} উল্লেখিত তিন সেনাপতির শাহাদাত ও হযরত খালীদ {রাঃ}-এর নেতৃত্ব গ্রহণের খবর মাদীনায় ঘোষণা করেছিলেন এভাবে,—“যায়িদ বিন হারিসা পতাকা হাতে নিয়ে শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করে। তারপর জা’ফার সেই পতাকা তুলে নেয় এবং সেও যুদ্ধ করে শাহীদ হয়। তারপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেই পতাকা হাতে তুলে নেয় এবং সেও শাহীদ হয়। অতঃপর “সাইফুন মিন সুয়ূফিল্লাহ”–আল্লাহর অন্যতম এক তরবারী সে পতাকা হাতে তুলে ধরে এবং তার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করেন।”-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল -২৮৬]
এইভাবে তিনি লাভ করেন ‘সাইফুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর অসি’ উপাধি।
অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, কোনো এক স্থানে হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ} অবস্থান করছিলেন। কেউ পাশ দিয়ে গেলে তিনি {ﷺ} জিজ্ঞেস করছিলেন,—“কে?”
জবাবে বলা হচ্ছিল,—“অমুক।”
এক সময় খালীদ {রাঃ} গেলেন।
রাসূল {ﷺ} জিজ্ঞেস করলেন,—“কে?”
বলা হলো,—“খালীদ।”
তিনি {ﷺ}বললেন,—“আল্লাহর বান্দাহ্ খালীদ কত ভালো। সে আল্লাহর অন্যতম এক তরবারী।” এটা মূতার পরের ঘটনা।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৪, আল-ইসাবা-১/৪১৩]
হযরত যায়িদ {রাঃ}, হযরত জা’ফার {রাঃ} ও হযরত আবদুল্লাহ {রাঃ}– এ তিন সেনাপতির অধীনে হযরত খালীদ {রাঃ} একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে মূ’তা অভিযানে যোগদান করেছিলেন। উল্লেখিত তিনজনের শেষ ব্যক্তি শাহাদাত বরণ করলে হযরত সাবিত ইবন আকরাম {রাঃ} দৌড়ে পতাকার কাছে যান এবং মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যাতে কোন বিশৃংখলা দেখা না দেয় সে জন্য ডান হাতে পতাকা উচু করে ধরেন। পতাকা তুলে ধরে তিনি এক দৌড়ে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর কাছে এসে বলেন,—“খুজ আল-লিওয়াআ ইয়া আবা সুলাইমান” অর্থাৎ “আবু সুলাইমান, পতাকাটি তুমি ধর”।
যে বাহিনীর মধ্যে প্রথম পর্ব ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারগণ ছিলেন, সেই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার কোন অধিকার-যে খালীদ {রাঃ}-এর মত নওমুসলিমের থাকতে পারেনা এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে হযরত সাবিত ইবন আকরাম {রাঃ}-কে বলেন,—“না, পতাকা আমি গ্রহণ করতে পারিনা, আপনিই এর যোগ্যতম ব্যক্তি। আপনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ এবং বদরী সাহাবী (অর্থাৎ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী)।”
হযরত সাবিত {রাঃ} জবাব দিলেন,—“ধরো, যুদ্ধে তুমি আমার থেকে পারদর্শী। এ পতাকা আমি তোমার জন্যই তুলে এনেছি।”
তারপর হযরত সাবিত {রাঃ} মুসলিম বাহিনীকে সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করেন,—“তোমারা কী খালীদের নেতৃত্বে রাজি?” তারা সমস্বরে জবাব দিল,—“হ্যাঁ, আমরা রাজি”।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৬-৮৭]
হযরত খালীদ {রাঃ} বলেন,—“মূ’তার যুদ্ধে আমার হাতে সাতখানি তরবারী ভাঙ্গে। অবশেষে একখানি ইয়ামানী তরবারী অক্ষত থাকে।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৪]
হুনাইন অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে গঠিত হয় মুসলিম বাহিনী। হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ } গোটা বাহিনীকে গোত্র ভিত্তিক কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। বনী সুলাইম গোত্র ছিল গোটা বাহিনীর পুরোভাগে। আর এর কম্যাণ্ডিং অফিসার ছিলেন হযরত খালীদ {রাঃ}। এ যুদ্ধে তিনি দারুণ সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর শরীরের একাধিক স্থানে আহত হয়। রাসূলুল্লাহ {ﷺ} তাঁকে দেখতে আসেন, তাঁর আহত স্থানসমূহে ফুঁক দেন এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন (সুবহানাল্লাহ্!)।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৫]
তায়িফ অভিযানে খালীদ {রাঃ} ছিলেন অগ্রগামী বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসার। হিজরী নবম সনে তাবুক অভিযানেও অংশগ্রহণ করেন। রাসূল {ﷺ} এ যুদ্ধে “দুমাতুল জান্দাল”–এর সরদার উকাইদার বিন আবদিল মালিকের বিরুদ্ধে চার শো সৈনিক সহ পাঠান। খালীদ {রাঃ} উকাইদারের ভাইকে হত্যা করেন এবং উকাইদারকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-{এর} খিদমাতে হাজির করেন।
হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} খালীদ {রাঃ}-কে দাওয়াতী কাজের উদ্দেশ্যে বনী যুজাইমা গোত্রে পাঠান। খালীদ {রাঃ}-এর দাওয়াতে বনী যুজাইমা গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অজ্ঞাতবশতঃ এলাকাবাসী সঠিক ভাষায় তা ব্যক্ত করতে না পারায় খালীদ {রাঃ} তাদের ভুল বুঝেন। তিনি আক্রমণের নির্দেশ দেন। ফলে, এই গোত্রের বহু লোক হতাহত হয়। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} বিষয়টি অবগত হয়ে ভীষণ দুঃখিত হন। তিনি হাত উঠিয়ে দু’আ করেন; —“হে আল্লাহ, আমি খালীদের এই কাজের ব্যাপারে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত”। তারপর হযরত আলী {রাঃ}-কে পাঠিয়ে তাদের সকল ক্ষতিপূরণ দান করেন। তাদের নিহত কুকুরগুলিরও ক্ষতিপূরণ আদায় করেন।-[রেফারেন্স : বুখারীঃ কিতাবুল মাগাযী, উসুদুল গাবা-২/৯৪]
এই ঘটনার পর হযরত খালীদ {রাঃ} মাদীনায় ফিরে এলে বিষয়টি নিয়ে তাঁর ও হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ {রাঃ}-এর মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে খালীদ {রাঃ} হযরত আবদুর রহমান {রাঃ}-কে কিছু গালমন্দ করেন। কথাটি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর কানে পৌঁছালে তিনি রেগে যান এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-কে বলেন,—“আমার সাহাবীদের গালি দেবে না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করে তবুও সে তাদের এক মুদ্রা বা তার অর্ধেক পরিমাণ ব্যয়ের সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবে না।”-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা -২/৯৫]
হিজরী দশম সনে হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ } খালীদ {রাঃ}-কে নাজরানের ‘বনী আবদিল মাদ্দান’ গোত্রে ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য পাঠান। যেহেতু হযরত খালীদ {রাঃ} বনু যুজাইমার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মারাত্মক ভুল করেছিলেন, এ কারণে রাসূল {ﷺ} যাত্রার পূর্বে তাঁকে বিশেষ হিদায়াত দেন,—“কেবল ইসলামের দাওয়াতই দেবে, কোন অবস্থাতেই তলোয়ার উঠাবে না”। তিনি এ হিদায়াত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তাঁর দাওয়াতে গোটা আবদুল মাদ্দান গোত্র ইসলাম কবুল করে। এভাবে রণক্ষেত্রের এক সৈনিক প্রথমবারের মত সত্যিকার ‘দায়ী-ই ইসলাম’ ইসলামের দাওয়াত দানকারী রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সকল নওমুসলিমকে তিনি তালীম ও তারবিয়াত দেন এবং তাদেরকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর দরবারে নিয়ে আসেন।
একই বছর ইয়ামনবাসীদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য হযরত আলী {রাঃ} ও হযরত খালীদ {রাঃ}-কে পাঠানো হয়। তাঁদের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইয়ামনবাসী ইসলাম কবুল করে।
হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ}-এর ইনতিকালের সাথে-সাথে আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ইসলাম ত্যাগকারী (মুরতাদ), নাবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার ও যাকাত অস্বীকারকারীদের মারাত্মক ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই ফিতনাবাজদের শির-দাঁড়া গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য খলীফা হযরত আবু বাকার সিদ্দীক {রাঃ} সেনা বাহিনী প্রস্তুত করে নিজেই যাত্রার জন্য ঘোড়ায় চড়লেন। কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবীগণ {রাঃ} মনে করলেন খলীফার এ সময় দারুল খিলাফা অর্থাৎ মাদীনায় থাকা উচিত। হযরত আলী {রাঃ} খলীফার ঘোড়ার লাগামটি ধরে জিজ্ঞেস করলেন,—“আল্লাহর রাসূলের খলীফা, কোন দিকে? উহুদের দিনে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} আপনাকে যে-কথা বলেছিলেন, আমি সে কথাই বলছিঃ ওহে আবু বাকার, তোমার তরবারি উম্মত্ত হয়ে গেছে, তুমি তোমার নিজেকে দিয়ে আমাদের ব্যথিত করো না।”
খলীফা সিদ্ধান্ত বাতিল করে মাদীনায় থেকে গেলেন। তিনি গোটা সেনা বাহিনীকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করেন এবং একটি ভাগের দায়িত্ব প্রদান করেন হযরত খালীদ {রাঃ}-কে। হযরত খালীদ {রাঃ}-কে মাদীনা থেকে বিদায় দেওয়ার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমার সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ }-কে বলতে শুনেছি,—“খালীদ আল্লাহর একটি তরবারি– যা আল্লাহ কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছেন। খালীদ আল্লাহর কতইনা ভালো বান্দা এবং গোত্রের কতই না ভালো ভ্রাতা”।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯১]
হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁর বাহিনী নিয়ে মাদীনা থেকে রওনা হন। প্রতিটি অভিযানের পূর্বে তিনি তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিতেন,—“তোমরা কৃষকদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে না। তাদের নিরাপদে থাকতে দেবে। তবে তাদের কেউ যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।”
ভণ্ড নবী তুলাইহার বিরুদ্ধে হযরত খালীদ {রাঃ} অভিযান পরিচালনা করেন। তুমুল লড়াই চলছে। প্রতিটি সংঘর্ষেই তুলাইহার সঙ্গীরা পরাজয় বরণ করছে।
একদিন তুলাইহা তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জিজ্ঞেস করলো,—“আমাদের এমন পরাজয় হচ্ছে কেন?”
তারা বললো,—“কারণ, আমাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীটি তার আগে মারা যাক। অন্যদিকে আমরা যাদের সাথে লড়ছি, তাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীর পূর্বে সে মৃত্যুবরণ করুক।”-[রেফারেন্স : হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৯৩]
হযরত খালীদ {রাঃ} তুলাইহার সঙ্গী-সাথীদের হত্যা করেন এবং তার ৩০ জন সঙ্গীকে বন্দী করে মাদীনায় পাঠান। তিনি ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করেন। হযরত হামযা {রাঃ}-এর হন্তা (পরবর্তীতে তিনি সাহাবী হন) হযরত ওয়াহশী {রাঃ}-এর হাতে ভণ্ড মুসাইলামা নিহত হয়।
ভণ্ড নবীদের ফিতনা নির্মূল করার পর হযরত খালীদ {রাঃ} যাকাত দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী ও মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী)—দের দিকে ধাবিত হন। সর্বপ্রথম আসাদ ও গাতফান গোত্রদ্বয়ে আঘাত হানেন। তাদের কিছু মারা যায়, কিছু বন্দী হয়, আর অবশিষ্টরা তাওবাহ্ করে আবার ইসলামে ফিরে আসে।-[রেফারেন্স : তারীখুল খুলাফাঃ সুয়ূতী-৭২]
মুরতাদদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল অভিযানে হযরত খালীদ {রাঃ} ছিলেন অগ্রভাগে। তাবারী বলেছে,—“মুরতাদদের বিরুদ্ধে অভিযানে যত বিজয় অর্জিত হয়েছে, তার সবই খালীদ {রাঃ} ও অন্যান্যদের কৃতিত্ব।”
আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা দমনের পর হযরত খালীদ {রাঃ} ইরাকের দিকে অগ্রসর হন। মুজার, কাইসার, আলীম, আমগীশীয়া, হীরা, আমবার, আইতুন তামার, দুমাতুল জান্দাল, হাসীদ, খানাফিস, সানা, বিশর, ও ফিরাদ প্রভৃতি যুদ্ধে তিনি অতুলনীয় সাহস ও কৌশল প্রদর্শন করে সমগ্র ইরাক পদানত করেন। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সাথে ইরাকীদের সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ফিরাদে। ফুরাতের এক তীরে মুসলিম বাহিনী ও অপর তীরে সম্মিলিত ইরাকী-বাহিনী। ইরাকীরা প্রস্তাব দিল,—“হয় তোমরা এপারে আস, না হয় আমাদের ওপারে যাওয়ার সুযোগ দাও।”
হযরত খালীদ {রাঃ} প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাদের এপারে আসার সুযোগ করে দিলেন। উভয় পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ শুরু হলো। মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেললো। পেছনে তাদের তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ ফুরাত নদী। পেছনে সরে গেলে ডুবে মরা এবং সামনে এগুলে মুসলিম সৈন্যদের তরবারীর শিকার হওয়া ছাড়া আর কোন পথ তাদের ছিল না। হযরত খালীদ {রাঃ} গোটা শত্রু বাহিনীকে এমন এক যাঁতাকলে আটক করে পিষে ফেলেন যা ইতিহাসে অতুলনীয়।
এ যুদ্ধের পর হযরত খালীদ {রাঃ} গোপনে হজ্জে চলে যান।
হযরত খালীদ {রাঃ} যখন ইরাকে যুদ্ধরত, সিরিয়ায় তখন অন্য একটি মুসলিম বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত। খালীদ {রাঃ}-এর ইরাক অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে খলীফার দরবার থেকে তাঁকে নির্দেশ দেয়া হলো সিরিয়ায় অবস্থানরত বাহিনী সাথে মিলিত হওয়ার জন্য। হযরত খালীদ {রাঃ} ইরাক থেকে বসরা উপস্থিত হলেন। পূর্ব থেকেই ইসলামী ফৌজ সেখানে খালীদ {রাঃ}-এর প্রতীক্ষায় ছিল। হযরত খালীদ {রাঃ} পৌঁছেই বসরা আক্রমণ করেন। বসরাবাসীর সন্ধি চুক্তি করে জীবন রক্ষা করে।
বসরা অভিযান শেষ করে হযরত খালীদ {রাঃ} ও হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} ‘আজনাদাইন’ পৌঁছেন। পূর্ব থেকেই হযরত আমর ইবনুল আস {রাঃ} সেখানে অবস্থান করছিলেন। হিজরী ১৩ সনে তুমুল লড়াই হয়। ‘আজনাদাইন’ হযরত খালীদ {রাঃ}-এর পদানত হয়।
সেনাপতি হযরত আবু উবাইদাহ {রাঃ}-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তিনি দিক থেকে দিমাশক অবরোধ করে বসে আছে। এক দিকের দায়িত্বে হযরত খালীদ {রাঃ} নিয়োজিত। তিন মাস অবরোধ করেও কোন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় দিমাশকের পাদ্রীর এক পুত্র সন্তান জম্ম লাভ করে। নগরীবাসী সেই জম্ম উৎসবে মদ পান করে আনন্দে বিভোর হয়ে পড়ে। হযরত খালীদ {রাঃ} যুদ্ধের সময় রাতে প্রায় ঘুমাতেন না। রাতে সামরিক ব্যবস্থাপনা ও দুশমনদের তথ্য সন্ধানে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি দিমাশকবাসীর অবস্থা অবগত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন, তাকবীর ধ্বনি শোনার সাথে সাথে তারা যেন নগর-প্রাচীরের ফটকে ছুটে গিয়ে আক্রমণ চালায়। এদিকে তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট সৈনিককে নির্বাচন করে রশির সাহায্যে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং অতর্কিতে ফটকের প্রহরীকে হত্যা করে তালা ভেঙ্গে তাকবীর দেওয়া শুরু করেন। তাকবীর শোনার সাথে সাথে বাইরে অপেক্ষমান সৈন্যরা একযোগে ভেতরে প্রবেশ করে। নগরবাসী তখন ঘুমে অচেতন। এমন অতর্কিত হামলায় তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনাপতি হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} নিকট সন্ধির প্রস্তাব দেয় এবং নিজেদের হাতে নগর প্রাচীরের অন্য দ্বারগুলি উম্মুক্ত করে দেয়। একদিকে হযরত খালীদ {রাঃ} বিজয়ীর বেশে, অন্যদিকে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে নগরের অর্ধেক যুদ্ধ করে দখল করা হয়, তবুও হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} গোটা নগরবাসীর সাথে সন্ধির শর্তানুযায়ী সমান আচরণ করেন।-[রেফারেন্স : তারীখঃ ইবনুল আসীর ৬/৩২৯]
ফাহলের যুদ্ধেও হযরত খালীদ {রাঃ} অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রবর্তী বাহিনীর কম্যাণ্ডার। রোমানরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। ফাহলের পর হযরত খালীদ {রাঃ} ও হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} হিমসের দিকে অগ্রসর হন। দিমাশকের প্রশাসনিক দায়িত্বে তখন হযরত ইয়ায়িদ বিন আবু সুফিয়ান {রাঃ}। রোমানরা পুনরায় দিমাশক দখলের পায়তারা চালায়। হযরত ইয়াযিদ {রাঃ} বাধা দেন। প্রচণ্ড লড়াই চলছে। এমন সময় পেছনের দিক থেকে ধুমকেতুর মত হাজির হলেন হযরত খালীদ {রাঃ}। রোমান বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য ছাড়া সকলেই খালীদ-বাহিনীর হাতে নিহত হয়।
সিরিয়ার বিভিন্ন ফ্রন্টে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের খবর শুনে এক পর্যায়ে তথাকার রোমান শাসক মুসলমানদের সাথে শান্তি চুক্তির ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তার পরিষদবর্গ তাকে যুদ্ধের প্ররোচনা দিয়ে বলে,—“আমরা অবশ্যই আবু বাকারের অশ্বারোহীদের আমাদের ভূমিতে প্রবেশে বাধা দেব।”
তারা সেনাপতি মাহানের নেতৃত্বে ২ লাখ ৪০ হাজার সদস্যের এক বিরাট বাহিনী ইয়ারমুকে সমাবেশ করে। তাদের পাদ্ররী পুরোহিতরাও নির্জবাস থেকে বেরিয়ে ধর্মের নামে জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলে। খলীফা হযরত আবু বাকার {রাঃ} এ খবর শুনে মন্তব্য করেন,—“আল্লাহর কসম, আমি খালীদের দ্বারা তাদের প্রবৃত্তির এ প্ররোচনার নিরাময় করবো।”
‘হ্যাঁ, খালিদ ছিলেন সেদিন রোমানদের সেই মহাব্যাধির ধস্বস্তরী প্রতিষেধক।’
হযরত খালীদ {রাঃ} ময়দানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন কম্যাণ্ডার পৃথকভাবে নিজ নিজ সৈন্য পরিচালনা করছে। তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণ দেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হামদ-সানার পর বলেন,—“আজকের এ দিনটি আল্লাহর অন্যতম একটি দিন। এ দিনে গর্ব ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা উচিত নয়। তোমরা তোমাদের জিহাদে নিষ্ঠাবান হও, তোমাদের কাজের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা কর। এসো আমরা ইমারাহ বা নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে নিই। আমাদের কেউ আজ, কেউ আগামীকাল এবং কেউ পরশু আমীর হোক। এভাবে তোমাদের সকলেই আমীর হবে। তোমরা আজকের দিনটি আমাকে ছেড়ে দাও।”
সকলে প্রস্তাবে রাজি হলো।-[রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫]
তিনি গোটা বাহিনীকে মোট ৩৮/৩৬ টি ভাগে একজন অফিসার নিয়োগ করেন। সেদিন তিনি মুসলিম বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যাস করেন যে, আরবরা পূর্বে তেমন আর কখনো দেখেনি।
ইয়ারমুকে মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ অবস্থান গ্রহণের পর হযরত খালীদ {রাঃ} মহিলাদের আহবান জানান এবং প্রথম বারের মত তাদের হাতে তরবারি দিয়ে নির্দেশ দেন, তোমরা মুসলিম মুজাহিদদের পেছনে অবস্থান গ্রহণ করবে। কাউকে পালিয়ে পেছনে সরে আসতে দেখলে তাকে এ তরবারি দিয়ে হত্যা করবে।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫]
এই তোড়জোড়ের মধ্যে একজন মুসলিম মুজাহিদ হতাশ কন্ঠে বললো,—“রোমানদের সংখ্যা কত বেশী, আর আমাদের সংখ্যা কত কম।”
হযরত খালীদ {রাঃ} তাকে বললেন,—“তোমার কথা ঠিক নয়। বরং একথা বল, রোমানরা কত কম, এবং মুসলমানরা কত বেশী –মানুষের সংখ্যা দ্বারা নয়; বরং বিজয়ের দ্বারা সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পরাজয়ের দ্বারা হ্রাস পায়। আল্লাহর কসম, যদি আমার ঘোড়ার ক্ষুর ভালো থাকতো আমি তাদের এ আধিক্যের পরোয়া করতাম না।”-[রেফারেন্স : তারীখুল উম্মাহ আল –ইসলামিয়াহ ১/১৯৩]
উল্লেখ্য যে, র্দীঘ ভ্রমণে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর ঘোড়া ‘আসকার’–এর ক্ষুর আহত হয়ে পড়েছিল।
ইয়ারমুক যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে রোমান সেনাপতি ‘মাহান’ দূত মারফত জানালো যে, সে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সাথে সরাসরি কথা বলতে চায়। খালীদ {রাঃ} রাজি হলেন। দু’বাহিনীর মধ্যবর্তী ময়দানে দু’সেনাপতি মুখোমুখি হলেন। রোমান সেনাপতি খালিদকে বললো,—“আমরা জেনেছি, কঠোর শ্রম ও ক্ষুধা তোমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। তোমরা চাইলে তোমাদের প্রত্যেককে আমরা দশটি দীনার, এক প্রস্থ পোশাক ও কিছু খাদ্য দিতে পারি। বিনিময়ে তোমরা দেশে ফিরে যাবে। আগামী বছরও অনুরূপ জিনিস আমি তোমাদের কাছে পাঠাবো।”
রোমান সেনাপতির এ কথায় যে– অপমান প্রচ্ছন্ন ছিল হযরত খালীদ {রাঃ} তা অনুধাবন করলেন। তিনি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উপযুক্ত জবাবটা ছুঁড়ে মারলেন। বললেন,—“ক্ষুধা আমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে আনেনি– যেমনটি তোমরা বলেছো। তবে আমরা একটি রক্তপায়ী জাতি। আমরা জেনেছি, রোমানদের রক্ত অপেক্ষা অধিক লোভনীয় ও পবিত্র রক্ত নাকি পৃথিবীতে আর নেই। তাই সেই রক্তের লোভে আমরা এসেছি।”
কথাগুলি ছুঁড়ে দিয়েই মহাবীর হযরত খালীদ {রাঃ} ঘোড়ার লাগাম ধরে টান দিলেন এবং সোজা নিজ বাহিনীতে ফিরে এসে ‘আল্লাহু আকবর, হুয়্যি রিয়াহাল জান্নাহ’ –ধ্বনি দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।
রোমান বাহিনী এমন ভয়ংকররূপ অগ্রসর হলো যে, আরবরা এমনটি আর কখনো দেখেনি। মুসলিম বাহিনীর মধ্যভাগের দায়িত্বে ছিলেন হযরত ইকরিমা বিন আবী জাহিল {রাঃ} ও হযরত কাকা ইবন আমর {রাঃ}। ঝযরত খালীদ {রাঃ} তাঁদের আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। তাঁরা দু’জন কবিতার মতো পংক্তি আবৃত্তি করতে করতে শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলো। হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁর গোটা বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। হযরত খালীদ {রাঃ} রোমান অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর মধ্যভাগে ঢুকে পড়লেন। তিনি যেদিকে গেলেন, রোমান বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লো। একাধারে একদিন ও এক রাত তুমুল লড়াই চললো। পরদিন সকালে হযরত খালীদ {রাঃ}-কে দেখা গেল রোমান সেনাপতির মঞ্চের ওপর। তাবারীর মতে, এ যুদ্ধে রণক্ষেত্রে নিহতদের ছাড়াও পশ্চাৎদিকে পলায়নপর সৈনিকদের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার রোমান সৈন্য জর্দান নদীতে ডুবে মারা যায়।
যুদ্ধ শেষ। পরদিন সকালে হযরত ইকরিমা {রাঃ} ও তাঁর পুত্র হযরত আমর বিন ইকরিমা {রাঃ}-কে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল। হযরত খালীদ {রাঃ} হযরত ইকরিমা {রাঃ}-এর মাথা নিজের উরু ও হযরত আমর {রাঃ}-এর মাথা পায়ের নলার ওপর রেখে, তাঁদের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন এবং গলায় ফোঁটা ফোঁটা পানি ঢালতে ঢালতে বলতে লাগলেন,—“ ‘ইবনুল হানতামা’ অর্থাৎ উমার মনে করেছিলেন আমরা শাহাদাত বরণ করতে জানিনে। কক্ষণো নয়।” এ যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন।-[রেফারেন্স : তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ -১/১৯৩]
সাইফুল্লাহ্ হযরত খালীদ ইবনুল ওয়ালিদ {রাঃ}-এর ব্যক্তিত্ব রোমান বাহিনীকে কতটুকু প্রভাবিত করেছিল বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যায়। ইয়ারমুকের যুদ্ধ তখন চলছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রোমান বাহুনীর এক কম্যাণ্ডার, নাম ‘জারজাহ’ নিজ ছাউনী থেকে বেরিয়ে এল। তার উদ্দেশ্য হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সাথে সরাসরি কথা বলা। হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁকে সময় ও সুযোগ দিলেন। জারজাহ বললো,—“খালীদ, আমাকে একটি সত্যি কথা বলুন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মিথ্যা বলেন না। আল্লাহ কি আকাশ থেকে আপনাদের নবীকে এমন কোন তরবারী দান করেছেন যা তিনি আপনাকে দিয়েছেন এবং সেই তরবারি যাদেরই বিরুদ্ধে উত্তোলিত হয়েছে, তারা পরাজিত হয়েছে?”
হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন,—“ না।”
জারজাহ বললো,—“তাহলে আপনাকে ‘সাইফুল্লাহ’–আল্লাহর তরবারী বলা হয় কেন?” হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন,—“আল্লাহ আমাদের মাঝে তাঁর রাসূল পাঠালেন। আমাদের কেউ তাঁকে বিশ্বাস করলো, কেউ করলো না। প্রথমে আমি ছিলাম শেষোক্ত দলে। অতঃপর আল্লাহ আমার অন্তর ঘুরিয়ে দেন। আমি তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনে তাঁর হাতে বাইয়াত করি। রাসূল {ﷺ} আমার জন্য দু’আ করেন। আমাকে তিনি {ﷺ } বলেন,—“তুমি আল্লাহর একটি তরবারী” এভাবে আমি হলাম ‘সাইফুল্লাহ’।” জারজাহ বললো,—“কিসের দিকে আপনারা আহবান জানান?” হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন, —“আল্লাহর একত্ব ও ইসলামের দিকে।”
জারজাহ বললো,—“কিভাবে? আপনারা তো এগিয়ে আছেন।” হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন, —“আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ} } সাথে উঠেছি, বসেছি। আমরা দেখেছি তাঁর {ﷺ} মা’জিযা ও অলৌকিক কর্মকাণ্ড। যা কিছু আমরা দেখেছি তা কেউ দেখলে, যা শুনেছি তা কেউ শুনলে, অবশ্যই তার উচিত সহজেই ইসলাম গ্রহণ করা। আর আপনারা যারা তাঁকে দেখেননি, তাঁর কথা শুনেননি, তারপরও অদৃশ্যের ওপর ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতিদান অধিকতর শ্রেষ্ঠ। যদি আপনারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন।” জারজাহ অশ্ব হাঁকিয়ে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,—খালীদ, আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।” জারজাহ ইসলাম গ্রহণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। এ দু’রাকাতই তার জীবনের প্রথম ও শেষ নামায। তারপর এ নওমুসলিম-রোমান শাহাদাতের বাসনা নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে চললেন রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। আল্লাহ পাক তার বাসনা পূর্ণ করলেন। তিনি শহীদ হলেন।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৯-৩০১]।
ইয়ারমুকে রোমান বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের খবর শুনে হিরাক্লিয়াস হিমস নগরী পেছনে ফেলে পিছু হটে যান। যাবার সময় তিনি বলেছিলেন –‘সালামুন আলাইকা ইয়া সুরিয়া সালামান লা লিকাআ বা’দাহ’ –হে সিরিয়া, তোমাকে বিদায়ী সালাম, যে সালামের পর আর কোন সাক্ষাৎ নেই। ইয়ারমুকের পর হযরত খালীদ {রাঃ} ‘হাদির’ জয় করেন।
হাদির অভিযান শেষ করে হযরত খালীদ {রাঃ} চললেন ‘কিন্নাসরীণ’ –এর দিকে। কিন্নাসরীনবাসীর
া আগে ভাগেই মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কিল্লায় প্রবেশ করে দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। হযরত খালিদ {রাঃ} তাদের লক্ষ্য করে বললেন,—“তোমরা যদি মেঘমালার ওপর আশ্রয় নাও আল্লাহ সেখানেও আমাকে উঠিয়ে নেবেন অথবা তোমাদের নামিয়ে নিয়ে আসবেন আমাদের কাছে।”-[রেফারেন্স : তারিখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ-২/৪] কিন্নাসরীণের অধিবাসীরা হিমসবাসীদের পরিণতি চিন্তা করে খালিদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে।
বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করা হয়েছে। এ অবরোধে মুসলিম বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসারদের মধ্যে হযরত খালীদ {রাঃ}ও আছেন। বাইতুল মুকাদ্দাসের খৃষ্টান অধিবাসীরা কোন দিশা না পেয়ে সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তারা আবদার রেখেছে স্বয়ং আমীরুল মুমিনীন উমার {রাঃ} নিজ হাতে সেই সন্ধিপত্রে সাক্ষর করবেন। তাদের আবদার রক্ষার জন্য খালিদ মাদীনা থেকে সিরিয়া এসেছেন। তিনি সিরিয়ায় অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর অফিসারবৃন্দকে ‘জাবিয়া’ তলব করেছেন। অত্যন্ত জাঁকজমক পোশাক পরে ঝযরত খালীদ {রাঃ} এসেছেন। খলীফার দৃষ্টিতে পড়তেই তিনি ঘোড়া থেকে নেমে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ করে বলেন,—“এত শিগগির অভ্যাস পাল্টে ফেলেছো?” হযরত খালীদ {রাঃ} হাতিয়ার উচু করে ধরে বললেন,—“তবে সৈনিক সুলভ অভ্যাস যায়নি।” খলীফা বললেন,—“তাহলে কোন দোষ নেই।” হিজরী ১৭ সনে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} ও হযরত খালীদ {রাঃ} যৌথভাবে হিমসের বিদ্রোহ দমন করেন। আর সেই সাথে সমগ্র সিরিয়ায় শত শত বছরের রোমান শাসনের অবসান ঘটে।
এতবড় সেনাপতিকেও খলীফা হযরত উমার {রাঃ} রেহাই দেননি। তিনি খালীদ {রাঃ}-কে সেনাপতির পদ থেকে সাধারণ সৈনিকের পদে নামিয়ে দেন। বরখাস্তের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য আছে। কারো মতে হযরত উমার {রাঃ}-এর খিলাফতের পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর হিজরী ১৭ সনে তাঁকে অপসারণ করা হয়। আবার কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত উমার {রাঃ} খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরই তাঁকে বরখাস্ত করেন, হযরত খালীদ {রাঃ} তখন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অপসারণের ঘটনা সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে এ ধারণা ও বিশ্বাস জন্ম লাভ করে যে, ইসলামের বিজয় মূলতঃ হযরত খালীদ {রাঃ}-এর বাহুবলের ওপর নির্ভরশীল। এর কারণে আল্লাহর উপর থেকে মানুষের তাওয়াক্কুল কমতে শুরু করে। এ ধরনের অমূলক ধারণা খলীফা হযরত উমার {রাঃ} মোটেই মনোপূত ছিল না। তিনি হযরত খালীদ {রাঃ}-কে অপসারণ করে এ বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণ করেন।
হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} খলীফার এ ফরমান লাভ করেন ইয়ারমুকের রণক্ষেত্রে। ইয়ারমুকে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। এমন সময় মাদীনা থেকে নতুন খলীফা উমার {রাঃ}-এর দূত একটি চিঠি নিয়ে রণাঙ্গনে উপস্থিত হলো। চিঠির বিষয়বস্তু দুইটি– হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর মৃত্যু সংবাদ এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-কে অপসারণ করে তাঁর স্থলে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর নিয়োগ। হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} চিঠিটি পাঠ করে হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর জন্য মাগফিরাত ও হযরত উমার {রাঃ}-এর সাফল্য কামনা করে দু’আ করলেন। তারপর পত্রবাহককে অনুরোধ করলেন সে যেন পত্রের বিষয় কারো কাছে প্রকাশ না করে। এভাবে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর মৃত্যু সংবাদ ও হযরত উমার {রাঃ}-এর নির্দেশ গোপন করে সৈন্যদের মনবলক্ষুন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করেন এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-এর কমাণ্ড চালিয়ে অব্যশ্যম্ভাবী বিজয় ছিনিয়ে আনেন। অতঃপর হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর হযরত খালীদ {রাঃ}-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে খলীফার ফরমান পাঠ করে শোনান এবং সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্তের ইঙ্গিত হিসাবে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর মাথা থেকে টুপি নামিয়ে নেন এবং পাগড়ি ঘাড়ের ওপর নামিয়ে দেন। খালীদ {রাঃ} শুধু মন্তব্য করেন,—“আমি খলীফার ফরমান শুনেছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এখনও আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মানতে এবং খিদমাত অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।”
খলীফা তাঁকে মাদীনায় তলব করেন। তিনি মাদীনায় পৌঁছলে তাঁর সম্পদের কঠোর হিসাব গ্রহণ করা হয়; কিন্তু কোন অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। অতঃপর খলীফা উমার {রাঃ} সর্বত্র ঘোষণা করে দেন,—“আমি খালীদকে আস্থাহীনতা, ক্রোধবশতঃ বা এ জাতীয় কোন কারণে অপসারণ করিনি।-[ইবনুল আসীর-২/৪১৮]
উল্লেখিত ঘটনা ছাড়াও হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অপসারণের আরো কারণ ছিল। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সৈনিক স্বভাবে ছিল রুক্ষতা। প্রতিটি কাজে তিনি নিজের মর্জিমত চলতেন, খলীফার সাথে পরামর্শের প্রয়োজন মনে করতেন না। সেনাবাহিনীর আয়-ব্যয়ের হিসাবও খলীফার দরবারে নিয়ম মত পাঠাতেন না। ইরাক অভিযান শেষ করেই তিনি খলীফা হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর অনুমতি ছাড়াই হজ্জের উদ্দেশ্যে মাক্কায় চলে যান। তাঁর এ কাজে হযরত আবু বাকার {রাঃ} ভীষণ বিরক্ত হন। খলীফা তাঁকে বার বার সতর্ক করেন। তিনি খলীফাকে জবাব দেন,—“আমাকে আমার মর্জিমত কাজ করার সুযোগ দিন, অন্যথায় আমি নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবো। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর এসব কাজে আবু বাকার {রাঃ}-এর সময় থেকেই হযরত উমার {রাঃ} অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি বার বার আবু বাকার {রাঃ}-কে পরামর্শ দান করেন হযরত খালীদ {রাঃ}-কে বরখাস্ত করার জন্য। হযরত আবু বাকার {রাঃ} প্রতিবারই জবাব দেন,—“আমি এমন তরবারীকে কোষবদ্ধ করতে পারিনা যাকে স্বয়ং আল্লাহ কোষমুক্ত করেছেন।”
হযরত উমার {রাঃ} খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর হযরত খালীদ {রাঃ}-কে সংশোধনের চেষ্টা করেন; কিন্তু ফলোদয় না হওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করেন।
বিষয়টি যেভাবে এবং যেমন করেই ঘটুক না কেন, এ ক্ষেত্রে হযরত খালিদের ভূমিকা লক্ষ্যণীয় বিষয়। তিনি যে আনুগত্য নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ইতিহাসে তার কোন নজীর পাওয়া যাবে না। এমনটি করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন এ কারণে যে, তিনি বিশ্বাস করতেন সেনাপতি ও সাধারণ সৈনিক –উভয় অবস্থা সমান। সর্ব অবস্থায় আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল {ﷺ} এবং যে দ্বীনের প্রতি তিনি ঈমান এনেছেন, তাদের সকলের প্রতি দায়িত্ব পালন করা নিজের অপরিহার্য কর্তব্য বলে মনে করতেন। একজন অনুগত সেনাপতি এবং একজন অনুগত সাধারণ সৈনিক– এ দু’য়ের মধ্যে মূলতঃ কোন প্রভেদ তাঁর দৃষ্টিতে ছিল না। তাই তিনি সেনাপতির পদ ছেড়ে সাধারণ সৈনিক হিসেবে সমানভাবে কাজ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। আর একই কারণে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর হাতে সেনাপতির দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার পর সাধারণ সৈনিকের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি বলতে পেরেছিলেন,—“এই উম্মাতের আমীন বা পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি আবু উবাইদাকে তোমাদের আমীর নিয়োগ করা হয়েছে।”
খলীফা হযরত উমার {রাঃ} হযরত খালীদ {রাঃ}-কে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করার পর তাঁকে বিভিন্ন প্রদেশে ওয়ালী ও গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন। হযরত খালীদ {রাঃ} এসময় তার কর্মজীবনের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌছান। তিনি খ্যাত হয়ে উঠেন এবং মুসলিমদের কাছে তিনি জাতীয় বীর গণ্য হতেন। জনসাধারণ তাকে সাইফউল্লাহ ("আল্লাহর তলোয়ার") বলে ডাকত। হযরত খালীদ {রাঃ} ‘মারাশ’ অধিকার করার কিছুকাল পর জানতে পারেন যে খ্যাতনামা কবি আশ’আস হযরত খালীদ {রাঃ}-এর প্রশংসা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। হযরত খালীদ {রাঃ} তাকে ১০,০০০ দিরহাম উপহার হিসেবে দেন।
খলীফা হযরত উমার {রাঃ} এই ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হিসেবে বিবেচনা করেন। হযরত উমার {রাঃ} হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-কে চিঠি লিখে আশ’আসকে দেয়া হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অর্থের উৎস বের করার নির্দেশ দেন। বলা হয়েছিল যে,—“যদি খালীদ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেন তবে তা ক্ষমতার অপব্যবহার। আর যদি তিনি নিজের অর্থ প্রদান করেন তবে তা অপচয়। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন।” হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-কে একাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} হযরত খালীদ =রাঃ}-এর গুণগ্রাহী ছিলেন এবং ছোট ভাইয়ের মত স্নেহ করতেন। ফলে এই দায়িত্ব পালন তার জন্য কঠিন ছিল। এর পরিবর্তে তিনি বিলাল ইবনে রাবাহকে এই দায়িত্ব দেন এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-কে চেলসিস থেকে এমেসায় তলব করেন। হযরত খালীদ {রাঃ} বলেন যে তিনি নিজের অর্থ থেকে এই উপহার দিয়েছেন। তিনি হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর কাছে উপস্থিত হলে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} তাকে জানান যে হযরত উমার {রাঃ}-এর নির্দেশে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে হযরত খালীদের {রাঃ} সামরিক জীবনের ইতি ঘটে এবং তিনি হেমসে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন।
বাহ্যিকভাবে খলীফা উমার {রাঃ} ও হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সম্পর্ক শীতল হলেও তারা একে অন্যের প্রতি খারাপ মনোভাব পোষণ করতেন না। মৃত্যুর আগে হযরত খালীদ {রাঃ} তার সম্পদ হযরত উমার {রাঃ}-এর হাতে অর্পণ করে যান এবং হযরত উমার {রাঃ}-কে নিজ অসিয়তের বাস্তবায়নকারী মনোনীত করেছিলেন।
পদচ্যুতির চার বছর পর ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দের হিজরী ২১/২২ সনে কিছু দিন অসুস্থ থাকার পর হযরত খালীদ {রাঃ} ইন্তেকাল করেন। সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর থেকে তিনি সেখানে বসবাস করছিলেন। তার মাজার শরীফ বর্তমানে খালীদ বিন ওয়ালীদ মসজিদের অংশ। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর কবরফলকে তার নেতৃত্বাধীনে জয় হওয়া ৫০টি যুদ্ধের নাম (ছোট যুদ্ধ ব্যতীত) উৎকীর্ণ রয়েছে। তিনি যুদ্ধে শাহীদ হতে ইচ্ছুক ছিলেন তাই বাড়িতে মৃত্যুর পূর্বে তিনি বিমর্ষ হয়ে যান।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি বেদনা নিয়ে বলেন,
—“আমি শাহাদাতের ইচ্ছা নিয়ে এত বেশি যুদ্ধে লড়াই করেছি যে আমার শরীরের কোনো অংশ ক্ষতচিহ্নবিহীন নেই যা বর্শা বা তলোয়ারের কারণে হয় নি। এরপরেও আমি এখানে, বিছানায় পড়ে একটি বৃদ্ধ উটের মতো মারা যাচ্ছি। কাপুরুষদের চোখ যাতে কখনো শান্তি না পায়।”
হযরত আবু বাকার {রাঃ} তার সম্পর্কে বলতেন,—“আর কোনো নারী কোনদিন খালীদের মত সন্তান গর্ভে ধারণ করবে না।” হযরত খালীদ {রাঃ}-এর মৃত্যুর পর খলীফা হযরত উমার {রাঃ} বলেছিলেন,—“নারীরা খালীদের মত সন্তান প্রসবে অক্ষম হয়ে গেছে।” হযরত খালীদ {রাঃ}-এর মৃত্যুর পর খলীফা অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে কেঁদেছিলেন। মানুষ পরে জেনেছিল, শুধু হযরত খালিদের {রাঃ}-এর বিয়োগ ব্যথায় তিনি এভাবে কাঁদেননি; বরং হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অপসারণের কারণ দূরীভূত হওয়ায় তিনি তাঁকে আবার সেনাপতির পদে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। মৃত্যু তাঁর সেই ইচ্ছার প্রতিবন্ধক হওয়ায় তিনি এত কেঁদেছিলেন।-[রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫]
প্রথম থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত হযরত খালীদ {রাঃ}-এর জিহাদের ময়দানে অতিবাহিত হয়েছে। এ কারণে হযরত রাসূলে পাকের {ﷺ} সুহবতে থাকার সুযোগ ও সময় খুব কম পেয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেন,—“জিহাদের ব্যস্ততা কুরআনের বিরাট একটি অংশ শিক্ষা থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছে।”-[আল ইসাবা-১/৪১৫]
তা সত্বেও সুহবতে নববীর ফয়েজ ও ইলমের সৌভাগ্য থেকে তিনি বঞ্চিত ছিলেন, তা নয়। রাসূলে পাকের {ﷺ} ইনতিকালের পর মাদীনার আলিম ও মুফতি সাহাবীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। তবে সৈনিক স্বভাবের কারণে ইফতা’র মসনদে কখনো তিনি বসেননি। তাঁর ফতোয়ার সংখ্যা দু’চারটির বেশী পাওয়া যায় না।-[আ’লামুল মুওয়াক্কিয়ীন] তিনি মোট ১৮টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে দু’টি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম এবং একটি বুখারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
একবার হযরত আম্মার বিন ইয়াসির {রাঃ} ও তাঁর মধ্যে ঝগড়া হয়। হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁকে ভীষণ গালমন্দ করেন। হযরত আম্মার {রাঃ}ও রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর নিকট শিকায়েত করেন। সকল বৃত্তান্ত শুনে রাসূল{ ﷺ} মন্তব্য করেন,—“যে আম্মারের সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে সে আল্লাহর সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে।”
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর ওপর রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} এ বাণীর এমন প্রতিক্রিয়া হলো যে, তিনি তক্ষুণি হযরত আম্মার {রাঃ}-এর কাছে ছুটে যান এবং তাঁকে খুশী করেন। হযরত খালীদ {রাঃ} নিজেই বলেছেন,—“রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর নিকট থেকে ওঠার পর আম্মারের সন্তুষ্টি অর্জন করা ছাড়া আমার নিকট অধিক প্রিয় আর কোন জিনিস ছিল না।”
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর হৃদয়ে রাসূলে পাক {ﷺ} -এর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা এত তীব্র ছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর শানে কেউ কোন সামান্য অমার্জিত কথা বললে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। একবার রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর নিকট কিছু স্বর্ণ এলো। তিনি তা নজদী সরদারদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। কুরাইশ ও আনসারদের কেউ কেউ এতে আপত্তি জানায়। এক ব্যক্তি বলে বসে,—“মুহাম্মাদ আল্লাহকে ভয় করুন।” রাসূল{ ﷺ } বললেন, —“আমি আল্লাহর নাফরমানী করলে আল্লাহর ইতায়াত বা আনুগত্য করে কে?” লোকটির এমন অমার্জিত কথায় হযরত খালীদ {রাঃ} ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন,—“ইয়া রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} ,অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই।” রাসূল (সা) তাঁকে শান্ত করেন।”-[রেফারেন্স : বুখারী শারীফ]
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও গৌরবজনক অধ্যায় ‘জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ’–আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। জীবনের বেশীর ভাগ সময় তাঁর রণক্ষেত্রে কেটেছে। তাঁর বীরত্বব্যঞ্জক কর্মকাণ্ড ও জিহাদের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কারণে হযরত রাসূলে পাক {ﷺ} -এর পক্ষ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। প্রায় ১৫০ মতান্তরে সোয়া শো যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। যেখানেই গেছেন বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন। তাঁর ওপর হযরত রাসূলে পাক {ﷺ} -এর এতখানি আস্থা ছিল যে, তাঁর হাতে পতাকা এলে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে যেতেন। প্রচুর সমরাস্ত্র তিনি পৈতৃক বিষয় হিসেবে লাভ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সব কিছুই আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দেন। (তাবাকাত) তাঁর বন্ধু ও শত্রুরা তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছে,—“তিনি এমন ব্যক্তি যিনি নিজেও ঘুমান না, অন্যকেও ঘুমাতে দেন না।”
হযরত খালীদ {রাঃ} নিজেই বলতেন,—“এমন একটি রাত্রি যা আমি নব বধুর সাথে কাটাতে পারি, অথবা যে রাত্রে আমাকে একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়– তা অপেক্ষা একটি প্রচণ্ড শীতের রাত্রে একটি মুহাজির দলের সাথে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালাই, তা আমার নিকট অধিক প্রিয়।”
মৃত্যুশয্যায় একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন,—“আমি শতাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, আমার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তরবারী, তীর অথবা বর্শার দু’একটি আঘাত রয়েছে। আর আজ আমি জ্বরাগ্রস্ত উটের মত বিছানায় পা দাপিয়ে মৃত্যুবরণ করছি।” কথাগুলি তিনি যখন বলছিলেন তখন তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল।-[রেফারে
ন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫-৩০৬, উসুদুল গাবা-২/৯৫]
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি খলীফা হযরত উমার {রাঃ}-এর অনুকূলে অসীয়াত করে যান। সেই পরিত্যক্ত সম্পত্তি তাঁর ঘোড়াটি ও কিছু যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবে জীবদ্দশায় তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তু-দু’টি মরণের পরও আল্লাহর রাস্তায় অয়াকফ করে যান।
হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ} নানা প্রসঙ্গে একাধিকবার তাঁর প্রশংসা করেছেন। মাক্কাহ্ বিজয়ের সময় একদিন কিছু দূরে হযরত খালীদ {রাঃ}-কে দেখা গেল। রাসূল{ ﷺ} আবু হুরাইরা {রাঃ}-কে বললেন,—“দেখোতো কে?”
তিনি বললেন,—“খালিদ।” রাসূল{ ﷺ} বললেন,—“আল্লাহর এ বান্দাটি কতই না ভালো।”
একবার রাসূল{ ﷺ} সাহাবীদের বলেন,—“খালীদকে তোমরা কষ্ট দেবে না। কারণ, সে কাফিরদের বিরুদ্ধে চালিত আল্লাহর তরবারি।”
একবার রাসূল{ ﷺ} হযরত উমার {রাঃ}-কে পাঠালেন যাকাত আদায়ের জন্য। ইবনে জামীল, হযরত খালীদ {রাঃ} ও হযরত আব্বাস {রাঃ} –এ তিনজন যাকাত দিতে অস্বীকার করলো। রাসূল{ ﷺ} একথা অবগত হয়ে বললেন,—“ইবনে জামীল ছিল দরিদ্র, আল্লাহ তাকে সম্পদশালী করেছেন। এ তার প্রতিদান। তবে খালীদের প্রতি তোমরা বাড়াবাড়ি করেছো। সে তার সকল যুদ্ধাস্ত্র আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছে। তার ওপর যাকাত হয় কেমন করে? আর আব্বাস? তার দায়িত্ব আমার ওপর। তোমাদের কি জানা নেই চাচা পিতৃস্থানীয়?-[রেফারেন্স : আবু দাউদ-১/১৬৩]
হযরত খালীদ {রাঃ} কেবল একজন সৈনিকই ছিলেন না, তিনি একজন দক্ষ দা’য়ী-ই-ইসলাম–ইসলামের দাওয়াত দানকারীও ছিলেন। বনী জুজাইমা ও মালিক ইবন নুওয়াইরার ব্যাপারে তরিৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে যে ক্ষতি হয় তা লক্ষ্য করে রাসূল{ ﷺ } পরর্তীতে দায়িত্ব দিয়ে কোথাও পাঠানোর সময় তাঁকে উপদেশ দেন,—“শুধু ইসলামের দাওয়াত দেবে, তলোয়ার ওঠাবে না।”
তেমনিভাবে ইয়ামনে পাঠানোর সময়ও নির্দেশ দেন,—“যুদ্ধের সূচনা যেন তোমার পক্ষ থেকে না হয়।” এ হিদায়াত লাভের পর যত যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন কোথাও কোন প্রকার বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে জানা যায় না। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ } -এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পরেও তিনি যথাযথভাবে দা’য়ীর দায়িত্ব পালন করেছেন। মাক্কাহ্ বিজয়ের পর রাসূল{ ﷺ} ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য চতুর্দিকে যে বিভিন্ন মিশন পাঠান, তার কয়েকটির দায়িত্ব হযরত খালীদ {রাঃ} পালন করেন। বনী যুজাইমা ও বনী আবদিল মাদ্দান তাঁরই চেষ্টায় ইসলাম গ্রহন করে। ইয়ামনের দাওয়াতী কাজে তিনি হযরত আলী {রাঃ}-এরসহযোগী ছিলেন। তাঁরই চেষ্টায় ভণ্ড নবী তুলাইহা আসাদীর সহযোগী বনী হাওয়াযিন, বনী সুলাইম, বনী আমের প্রভৃতি গোত্র পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে। এছাড়াও অসংখ্য লোক বিভিন্ন সময় তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করে। প্রতিটি যুদ্ধ শুরুর আগে ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষকে সব সময় তিনি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে প্রচণ্ড যুদ্ধের মাঝেও তিনি সফল দায়ীর ভূমিকা পালিন করেছেন। ইয়ারমুকের রোমান সৈনিক ‘জারজাহ’ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
সংক্ষিপ্ত কোন প্রবন্ধে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর জীবনের সব কথা তুলে ধরা যাবে না। আমীরুল মু’মিনীন উমার {রাঃ} খালীদ {রাঃ}-এর মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে যে –কথাগুলি বলেছিলেন, আমিও সেই কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করছি, “রাহেমাল্লাহ আবা সুলাইমান, মাইনদাল্লাহ খায়রুন মিম্মা কানা ফীহিল্লা, লাকাদ আশা হামীদান ওয়া মাতা সা’ঈদান”– আল্লাহ আবু সুলাইমান খালিদের ওপর রহম করুন। তিনি যে অবস্থায় ছিলেন আল্লাহর কাছে তার থেকে উত্তম কিছু নেই। তিনি জীবনে প্রশংসিত এবং মরণে সৌভাগ্যবান।-[রেফারেন্স : +রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৮]
হুব্বে সাহাবা জিন্দাবাদ...
বুগযে সাহাবা মুরদাবাদ...
ওয়া রহমাতুল্লাহ্
ﺑِﺴﻢِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟﺮَّﺣﻤٰﻦِ ﺍﻟﺮَّﺣﻴﻢِ
দ্য সোওর্ড অফ আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’য়ালা
সাহাবীয়ে রাসূল সাইফুল্লাহ {রাঃ}-এর নামে মিথ্যা-কুৎসারটন
াকারীগণ হুশিয়ার, সাবধান!!!!! তোমরা যে ঘটনাগুলো বিকৃত করেছ তার সত্য ঘটনা হাদীস থেকে বর্ণিত রেফারেন্স সহ দেয়া হল দেখে নাও, এখনও সময় আছে আল্লাহর লা’নত থেকে নিজেদের বাঁচাও
নাম : আবু সুলাইমান খালীদ।
লকব : “সাইফুল্লাহ” (আল্লাহর তরবারি)।
পিতা : ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা এবং
মাতা : লুবাবা আস-সুগরা, উম্মুল মু’মিনীন খাতুন মাইমুনা বিনতুল হারিস {রাঃ} ও হযরত আব্বাস বিন আবদিল মুত্তালিব {রাঃ}-এর স্ত্রী লুবাবা আল-কুবরা’র বোন।
রাসূল {ﷺ}-এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক : প্রিয় রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} ও হযরত আব্বাস {রাঃ} তাঁর খালু।-[উসুদুল গাবা-২/৯৩)]
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর খান্দান ছিল জাহিলী আরবের কুরাইশদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত। কুব্বা ও আয়িন্না (সৈন্য ও সেনা ক্যাম্পের পরিচালন দায়িত্ব)–এ দু’টি দায়িত্ব ছিল তাঁর খান্দানের ওপর। ইসলামের অভ্যুদয়ের সময় খালীদ {রাঃ} ছিলেন এই পদে অধিষ্ঠিত।-[রেফারেন্স : আল-ইসতিয়াব-১/১৫৭]
হুদাইবীয়ার সন্ধির প্রাক্কালে মুসলমানদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য কুরাইশদের যে দলটি মাক্কাহ্ থেকে বের হয়েছিল, তার নেতা ছিলেন খালীদ। উহুদ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েন এবং মাক্কার মুশরিক বাহিনীর সুনিশ্চিত পরাজয়কে বিজয়ে রূপদান করেন।
হযরত খালীদ ইসলাম গ্রহণের সময় সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তবে মাক্কাহ্ বিজয়ের ৪ মাস পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি আছে।
হযরত আমর ইবনুল আস {রাঃ} কুরাইশদেরকে ‘হাবশা’য় যাবার কথা বলে গোপনে মাদীনায় চলেছেন ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে। পথে মাদীনা অভিমুখী আরেকটি কাফিলার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। তারাও চলেছেন একই উদ্দেশ্যে মাদীনায়। দ্বিতীয় এই দলটির সাথে ছিলেন হযরত খালীদ। আমর ইবনুল আস খালীদকে জিজ্ঞেস করলেন,—“কোন দিকে?” খালীদ জবাব দিলেন,—“আল্লাহর কসম, আমার নিশ্চিত বিশ্বাস এ ব্যক্তি {ﷺ} একজন নবী– আর কতদিন এভাবে চলবে চলো যাই ইসলাম গ্রহণ করি।”-[রেফারেন্স : আল-ইসাবা-১/৪১৩, মুসনাদে আহমাদ]
তারা মাদীনায় রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর খিদমাতে হাজির হলেন। প্রথমে খালীদ, তারপর আমর ইবনুল আস রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর হাতে বাইয়াত করেন। আমর মাক্কায় ফিরে আসেন; কিন্তু খালীদ মাদীনায় থেকে যান।
হযরত খালীদ {রাঃ} বলেন,—“আমার ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} আমাকে বলেছিলেন,—“তোমার মধ্যে বুদ্ধির ছাপ দেখেছিলাম, আমার আশা ছিল এ বুদ্ধি শেষ পর্যন্ত তোমাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের কাছেই সমর্পন করবে।” খালীদ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর হাতে বাইয়াত করার সময় বলেছিলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}! আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে যত পাপ আমি করেছি তা ক্ষমার জন্য আপনি দু’আ করুন। রাসূল {ﷺ} বলেছিলেন,—“ইসলাম অতীতের সকল গুনাহ-খাতা নিশ্চিহ্ন করে দেয়।” আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}! এ কথার ওপরই আমি বাইয়াত করলাম। তিনি {ﷺ } বললেন,—“হে আল্লাহ, তোমার পথে বাধা সৃষ্টি করে যত অপরাধ সে করেছে, তুমি তা ক্ষমা করে দাও।”-[রেফারেন্
স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৪-৮৫]
ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} তাঁর ইসলাম— পূর্ব খান্দানী সামরিক পদে বহাল রেখে তাঁর খিদমাত গ্রহণ করেন।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৩]
মাক্কাহ্ বিজয়কালে তিনি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর সঙ্গী ছিলেন। রাসূল {ﷺ} মুসলিম বাহিনীর দক্ষিণ ভাগের দায়িত্ব তাঁকে দেন। বিনা রক্তপাতে মাক্কাহ্ বিজয় হলেও খালীদ {রাঃ}-এর হাতে সেদিন কতিপয় মুশরিক প্রাণ হারায়। তিনি “কুদার” দিক দিয়ে মাক্কায় ঢুকছিলেন, পথে মাক্কার একটি মুশরিক দলের মুখোমুখি হন। মুশরিকরা তীর নিক্ষেপ শুরু করে। তিনি তীর ছুঁড়ে তাদের জবাব দেন। এরপর মুখোমুখি সংঘর্ষে কয়েকজন মুশরিক নিহত হয়। এজন্য তাঁকে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর নিকট জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু রাসূল {ﷺ } যখন জানলেন, মুশরিকরাই প্রথম আক্রমণ চালিয়াছে এবং বিনা অপরাধে তারা দু’জন সাহাবী {রাঃ}-কে শাহীদ করেছে তখন তিনি এটাকে আল্লাহর ইচ্ছা হিসাবে মেনে নিয়ে চুপ করে যান।
জাহিলী আরবের কুরাইশদের মূর্তি পূজার কেন্দ্রসমূহের একটি ছিল ‘উযযা’। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ } হযরত খালীদ {রাঃ}-কে পাঠালেন কেন্দ্রটি ধ্বংসের জন্য। তিনি সেখানে পৌঁছে নিম্নের পংক্তিটি আবৃতি করতে করতে কেন্দ্রটি মাটিতে মিশিয়ে দেনঃ “ওহে উযযা,
তুমি পবিত্র নও,
আমরা তোমার অস্বীকার করি,
আমি দেখেছি,
আল্লাহ তোমায় অপমানিত করেছেন।”-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৪]
ইসলাম পূর্ব জীবনে তিনি ছিলেন মুসলমানদের চরম দুশমন, আর ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের দুশমনদের জন্য হয়ে দাঁড়ান ভীষণ বিপদজ্জনক। অসংখ্য যুদ্ধে তাঁর তরবারী মুরতাদ-ইহুদী-মুশরিক-খ্রিষ্টানদের ঐক্য ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত খালীদ {রাঃ} সর্বপ্রথম ‘মূ’তা’ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} দাওয়াতী কার্যক্রমের আওতায় হযরত হারিস বিন উমাইর আযাদী {রাঃ}-কে একটি পত্রসহ ‘বসরা’র শাসকের নিকট পাঠান। শুরাহবীল বিন আমর গাসসানী মূ’তা নামক স্থানে হযরত হারিস {রাঃ}-কে হত্যা করে।
এ ঘটনার প্রতিশোধকল্পে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} হযরত যায়িদ বিন হারিসা {রাঃ}-এর নেতৃত্বে দু’হাজার সৈন্যের এক বাহিনী পাঠান। প্রতিপক্ষ রোমান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল দু’লাখ। আমার নাবী {ﷺ } যে গায়িবের খবরদানকারী এখানেই প্রমাণ দেখুন, যায়িদ বিন হারিসা {রাঃ}-এর বাহিনী মাদীনা থেকে যাত্রার পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} তাঁদের উপদেশ দেন,—“যুদ্ধে যায়িদ যদি শাহীদ হয় তাহলে জা’ফার এবং জা’ফার শাহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বাহিনীর নেতৃত্ব দেবে। আর যদি আবদুল্লাহও শহীদ হয় তাহলে তোমরা তোমাদের কাউকে আমীর বানিয়ে নেবে।”
তাঁরা ছিলেন তিনজন— রাসূল {ﷺ}-এর পালক পুত্র হযরত যায়িদ {রাঃ}, হযরত আলী {রাঃ}-এর ভাই হযরত জা’ফার {রাঃ} ও হযরত আবদুল্লাহ {রাঃ}। তাঁরা সিরিয়ার মূ’তা অভিযানের তিন বীর। এ অসম যুদ্ধে তাঁরা নজীরবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একে-একে শাহাদাত বরণ করেন। অবশেষে হযরত খালীদ {রাঃ} নেতৃত্ব লাভ করেন। একের পর এক তিনজন সেনাপতির শাহাদাত বরণে মুসলিম বাহিনী একদম সাহস হারিয়ে ফেলে এবং হতাশা-উৎকণ্ঠায় অবস্থা খুবই চরম ও নাজেহাল হয়ে যায়। হযরত খালীদ {রাঃ} শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে না পারলেও অতুলনীয় রণকৌশলে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করেন।
হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ} উল্লেখিত তিন সেনাপতির শাহাদাত ও হযরত খালীদ {রাঃ}-এর নেতৃত্ব গ্রহণের খবর মাদীনায় ঘোষণা করেছিলেন এভাবে,—“যায়িদ বিন হারিসা পতাকা হাতে নিয়ে শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করে। তারপর জা’ফার সেই পতাকা তুলে নেয় এবং সেও যুদ্ধ করে শাহীদ হয়। তারপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেই পতাকা হাতে তুলে নেয় এবং সেও শাহীদ হয়। অতঃপর “সাইফুন মিন সুয়ূফিল্লাহ”–আল্লাহর অন্যতম এক তরবারী সে পতাকা হাতে তুলে ধরে এবং তার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করেন।”-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল -২৮৬]
এইভাবে তিনি লাভ করেন ‘সাইফুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর অসি’ উপাধি।
অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, কোনো এক স্থানে হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ} অবস্থান করছিলেন। কেউ পাশ দিয়ে গেলে তিনি {ﷺ} জিজ্ঞেস করছিলেন,—“কে?”
জবাবে বলা হচ্ছিল,—“অমুক।”
এক সময় খালীদ {রাঃ} গেলেন।
রাসূল {ﷺ} জিজ্ঞেস করলেন,—“কে?”
বলা হলো,—“খালীদ।”
তিনি {ﷺ}বললেন,—“আল্লাহর বান্দাহ্ খালীদ কত ভালো। সে আল্লাহর অন্যতম এক তরবারী।” এটা মূতার পরের ঘটনা।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৪, আল-ইসাবা-১/৪১৩]
হযরত যায়িদ {রাঃ}, হযরত জা’ফার {রাঃ} ও হযরত আবদুল্লাহ {রাঃ}– এ তিন সেনাপতির অধীনে হযরত খালীদ {রাঃ} একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে মূ’তা অভিযানে যোগদান করেছিলেন। উল্লেখিত তিনজনের শেষ ব্যক্তি শাহাদাত বরণ করলে হযরত সাবিত ইবন আকরাম {রাঃ} দৌড়ে পতাকার কাছে যান এবং মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যাতে কোন বিশৃংখলা দেখা না দেয় সে জন্য ডান হাতে পতাকা উচু করে ধরেন। পতাকা তুলে ধরে তিনি এক দৌড়ে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর কাছে এসে বলেন,—“খুজ আল-লিওয়াআ ইয়া আবা সুলাইমান” অর্থাৎ “আবু সুলাইমান, পতাকাটি তুমি ধর”।
যে বাহিনীর মধ্যে প্রথম পর্ব ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারগণ ছিলেন, সেই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার কোন অধিকার-যে খালীদ {রাঃ}-এর মত নওমুসলিমের থাকতে পারেনা এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে হযরত সাবিত ইবন আকরাম {রাঃ}-কে বলেন,—“না, পতাকা আমি গ্রহণ করতে পারিনা, আপনিই এর যোগ্যতম ব্যক্তি। আপনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ এবং বদরী সাহাবী (অর্থাৎ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী)।”
হযরত সাবিত {রাঃ} জবাব দিলেন,—“ধরো, যুদ্ধে তুমি আমার থেকে পারদর্শী। এ পতাকা আমি তোমার জন্যই তুলে এনেছি।”
তারপর হযরত সাবিত {রাঃ} মুসলিম বাহিনীকে সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করেন,—“তোমারা কী খালীদের নেতৃত্বে রাজি?” তারা সমস্বরে জবাব দিল,—“হ্যাঁ, আমরা রাজি”।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৬-৮৭]
হযরত খালীদ {রাঃ} বলেন,—“মূ’তার যুদ্ধে আমার হাতে সাতখানি তরবারী ভাঙ্গে। অবশেষে একখানি ইয়ামানী তরবারী অক্ষত থাকে।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৪]
হুনাইন অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে গঠিত হয় মুসলিম বাহিনী। হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ } গোটা বাহিনীকে গোত্র ভিত্তিক কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। বনী সুলাইম গোত্র ছিল গোটা বাহিনীর পুরোভাগে। আর এর কম্যাণ্ডিং অফিসার ছিলেন হযরত খালীদ {রাঃ}। এ যুদ্ধে তিনি দারুণ সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর শরীরের একাধিক স্থানে আহত হয়। রাসূলুল্লাহ {ﷺ} তাঁকে দেখতে আসেন, তাঁর আহত স্থানসমূহে ফুঁক দেন এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন (সুবহানাল্লাহ্!)।-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা-২/৯৫]
তায়িফ অভিযানে খালীদ {রাঃ} ছিলেন অগ্রগামী বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসার। হিজরী নবম সনে তাবুক অভিযানেও অংশগ্রহণ করেন। রাসূল {ﷺ} এ যুদ্ধে “দুমাতুল জান্দাল”–এর সরদার উকাইদার বিন আবদিল মালিকের বিরুদ্ধে চার শো সৈনিক সহ পাঠান। খালীদ {রাঃ} উকাইদারের ভাইকে হত্যা করেন এবং উকাইদারকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-{এর} খিদমাতে হাজির করেন।
হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} খালীদ {রাঃ}-কে দাওয়াতী কাজের উদ্দেশ্যে বনী যুজাইমা গোত্রে পাঠান। খালীদ {রাঃ}-এর দাওয়াতে বনী যুজাইমা গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অজ্ঞাতবশতঃ এলাকাবাসী সঠিক ভাষায় তা ব্যক্ত করতে না পারায় খালীদ {রাঃ} তাদের ভুল বুঝেন। তিনি আক্রমণের নির্দেশ দেন। ফলে, এই গোত্রের বহু লোক হতাহত হয়। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} বিষয়টি অবগত হয়ে ভীষণ দুঃখিত হন। তিনি হাত উঠিয়ে দু’আ করেন; —“হে আল্লাহ, আমি খালীদের এই কাজের ব্যাপারে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত”। তারপর হযরত আলী {রাঃ}-কে পাঠিয়ে তাদের সকল ক্ষতিপূরণ দান করেন। তাদের নিহত কুকুরগুলিরও ক্ষতিপূরণ আদায় করেন।-[রেফারেন্স : বুখারীঃ কিতাবুল মাগাযী, উসুদুল গাবা-২/৯৪]
এই ঘটনার পর হযরত খালীদ {রাঃ} মাদীনায় ফিরে এলে বিষয়টি নিয়ে তাঁর ও হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ {রাঃ}-এর মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে খালীদ {রাঃ} হযরত আবদুর রহমান {রাঃ}-কে কিছু গালমন্দ করেন। কথাটি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর কানে পৌঁছালে তিনি রেগে যান এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-কে বলেন,—“আমার সাহাবীদের গালি দেবে না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করে তবুও সে তাদের এক মুদ্রা বা তার অর্ধেক পরিমাণ ব্যয়ের সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবে না।”-[রেফারেন্স : উসুদুল গাবা -২/৯৫]
হিজরী দশম সনে হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ } খালীদ {রাঃ}-কে নাজরানের ‘বনী আবদিল মাদ্দান’ গোত্রে ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য পাঠান। যেহেতু হযরত খালীদ {রাঃ} বনু যুজাইমার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মারাত্মক ভুল করেছিলেন, এ কারণে রাসূল {ﷺ} যাত্রার পূর্বে তাঁকে বিশেষ হিদায়াত দেন,—“কেবল ইসলামের দাওয়াতই দেবে, কোন অবস্থাতেই তলোয়ার উঠাবে না”। তিনি এ হিদায়াত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তাঁর দাওয়াতে গোটা আবদুল মাদ্দান গোত্র ইসলাম কবুল করে। এভাবে রণক্ষেত্রের এক সৈনিক প্রথমবারের মত সত্যিকার ‘দায়ী-ই ইসলাম’ ইসলামের দাওয়াত দানকারী রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সকল নওমুসলিমকে তিনি তালীম ও তারবিয়াত দেন এবং তাদেরকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ}-এর দরবারে নিয়ে আসেন।
একই বছর ইয়ামনবাসীদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য হযরত আলী {রাঃ} ও হযরত খালীদ {রাঃ}-কে পাঠানো হয়। তাঁদের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইয়ামনবাসী ইসলাম কবুল করে।
হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ}-এর ইনতিকালের সাথে-সাথে আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ইসলাম ত্যাগকারী (মুরতাদ), নাবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার ও যাকাত অস্বীকারকারীদের মারাত্মক ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই ফিতনাবাজদের শির-দাঁড়া গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য খলীফা হযরত আবু বাকার সিদ্দীক {রাঃ} সেনা বাহিনী প্রস্তুত করে নিজেই যাত্রার জন্য ঘোড়ায় চড়লেন। কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবীগণ {রাঃ} মনে করলেন খলীফার এ সময় দারুল খিলাফা অর্থাৎ মাদীনায় থাকা উচিত। হযরত আলী {রাঃ} খলীফার ঘোড়ার লাগামটি ধরে জিজ্ঞেস করলেন,—“আল্লাহর রাসূলের খলীফা, কোন দিকে? উহুদের দিনে রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} আপনাকে যে-কথা বলেছিলেন, আমি সে কথাই বলছিঃ ওহে আবু বাকার, তোমার তরবারি উম্মত্ত হয়ে গেছে, তুমি তোমার নিজেকে দিয়ে আমাদের ব্যথিত করো না।”
খলীফা সিদ্ধান্ত বাতিল করে মাদীনায় থেকে গেলেন। তিনি গোটা সেনা বাহিনীকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করেন এবং একটি ভাগের দায়িত্ব প্রদান করেন হযরত খালীদ {রাঃ}-কে। হযরত খালীদ {রাঃ}-কে মাদীনা থেকে বিদায় দেওয়ার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমার সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ }-কে বলতে শুনেছি,—“খালীদ আল্লাহর একটি তরবারি– যা আল্লাহ কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছেন। খালীদ আল্লাহর কতইনা ভালো বান্দা এবং গোত্রের কতই না ভালো ভ্রাতা”।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯১]
হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁর বাহিনী নিয়ে মাদীনা থেকে রওনা হন। প্রতিটি অভিযানের পূর্বে তিনি তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিতেন,—“তোমরা কৃষকদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে না। তাদের নিরাপদে থাকতে দেবে। তবে তাদের কেউ যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।”
ভণ্ড নবী তুলাইহার বিরুদ্ধে হযরত খালীদ {রাঃ} অভিযান পরিচালনা করেন। তুমুল লড়াই চলছে। প্রতিটি সংঘর্ষেই তুলাইহার সঙ্গীরা পরাজয় বরণ করছে।
একদিন তুলাইহা তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জিজ্ঞেস করলো,—“আমাদের এমন পরাজয় হচ্ছে কেন?”
তারা বললো,—“কারণ, আমাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীটি তার আগে মারা যাক। অন্যদিকে আমরা যাদের সাথে লড়ছি, তাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীর পূর্বে সে মৃত্যুবরণ করুক।”-[রেফারেন্স : হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৯৩]
হযরত খালীদ {রাঃ} তুলাইহার সঙ্গী-সাথীদের হত্যা করেন এবং তার ৩০ জন সঙ্গীকে বন্দী করে মাদীনায় পাঠান। তিনি ভণ্ড নবী মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করেন। হযরত হামযা {রাঃ}-এর হন্তা (পরবর্তীতে তিনি সাহাবী হন) হযরত ওয়াহশী {রাঃ}-এর হাতে ভণ্ড মুসাইলামা নিহত হয়।
ভণ্ড নবীদের ফিতনা নির্মূল করার পর হযরত খালীদ {রাঃ} যাকাত দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী ও মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী)—দের দিকে ধাবিত হন। সর্বপ্রথম আসাদ ও গাতফান গোত্রদ্বয়ে আঘাত হানেন। তাদের কিছু মারা যায়, কিছু বন্দী হয়, আর অবশিষ্টরা তাওবাহ্ করে আবার ইসলামে ফিরে আসে।-[রেফারেন্স : তারীখুল খুলাফাঃ সুয়ূতী-৭২]
মুরতাদদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল অভিযানে হযরত খালীদ {রাঃ} ছিলেন অগ্রভাগে। তাবারী বলেছে,—“মুরতাদদের বিরুদ্ধে অভিযানে যত বিজয় অর্জিত হয়েছে, তার সবই খালীদ {রাঃ} ও অন্যান্যদের কৃতিত্ব।”
আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা দমনের পর হযরত খালীদ {রাঃ} ইরাকের দিকে অগ্রসর হন। মুজার, কাইসার, আলীম, আমগীশীয়া, হীরা, আমবার, আইতুন তামার, দুমাতুল জান্দাল, হাসীদ, খানাফিস, সানা, বিশর, ও ফিরাদ প্রভৃতি যুদ্ধে তিনি অতুলনীয় সাহস ও কৌশল প্রদর্শন করে সমগ্র ইরাক পদানত করেন। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সাথে ইরাকীদের সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ফিরাদে। ফুরাতের এক তীরে মুসলিম বাহিনী ও অপর তীরে সম্মিলিত ইরাকী-বাহিনী। ইরাকীরা প্রস্তাব দিল,—“হয় তোমরা এপারে আস, না হয় আমাদের ওপারে যাওয়ার সুযোগ দাও।”
হযরত খালীদ {রাঃ} প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাদের এপারে আসার সুযোগ করে দিলেন। উভয় পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ শুরু হলো। মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেললো। পেছনে তাদের তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ ফুরাত নদী। পেছনে সরে গেলে ডুবে মরা এবং সামনে এগুলে মুসলিম সৈন্যদের তরবারীর শিকার হওয়া ছাড়া আর কোন পথ তাদের ছিল না। হযরত খালীদ {রাঃ} গোটা শত্রু বাহিনীকে এমন এক যাঁতাকলে আটক করে পিষে ফেলেন যা ইতিহাসে অতুলনীয়।
এ যুদ্ধের পর হযরত খালীদ {রাঃ} গোপনে হজ্জে চলে যান।
হযরত খালীদ {রাঃ} যখন ইরাকে যুদ্ধরত, সিরিয়ায় তখন অন্য একটি মুসলিম বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত। খালীদ {রাঃ}-এর ইরাক অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে খলীফার দরবার থেকে তাঁকে নির্দেশ দেয়া হলো সিরিয়ায় অবস্থানরত বাহিনী সাথে মিলিত হওয়ার জন্য। হযরত খালীদ {রাঃ} ইরাক থেকে বসরা উপস্থিত হলেন। পূর্ব থেকেই ইসলামী ফৌজ সেখানে খালীদ {রাঃ}-এর প্রতীক্ষায় ছিল। হযরত খালীদ {রাঃ} পৌঁছেই বসরা আক্রমণ করেন। বসরাবাসীর সন্ধি চুক্তি করে জীবন রক্ষা করে।
বসরা অভিযান শেষ করে হযরত খালীদ {রাঃ} ও হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} ‘আজনাদাইন’ পৌঁছেন। পূর্ব থেকেই হযরত আমর ইবনুল আস {রাঃ} সেখানে অবস্থান করছিলেন। হিজরী ১৩ সনে তুমুল লড়াই হয়। ‘আজনাদাইন’ হযরত খালীদ {রাঃ}-এর পদানত হয়।
সেনাপতি হযরত আবু উবাইদাহ {রাঃ}-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তিনি দিক থেকে দিমাশক অবরোধ করে বসে আছে। এক দিকের দায়িত্বে হযরত খালীদ {রাঃ} নিয়োজিত। তিন মাস অবরোধ করেও কোন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় দিমাশকের পাদ্রীর এক পুত্র সন্তান জম্ম লাভ করে। নগরীবাসী সেই জম্ম উৎসবে মদ পান করে আনন্দে বিভোর হয়ে পড়ে। হযরত খালীদ {রাঃ} যুদ্ধের সময় রাতে প্রায় ঘুমাতেন না। রাতে সামরিক ব্যবস্থাপনা ও দুশমনদের তথ্য সন্ধানে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি দিমাশকবাসীর অবস্থা অবগত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন, তাকবীর ধ্বনি শোনার সাথে সাথে তারা যেন নগর-প্রাচীরের ফটকে ছুটে গিয়ে আক্রমণ চালায়। এদিকে তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট সৈনিককে নির্বাচন করে রশির সাহায্যে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং অতর্কিতে ফটকের প্রহরীকে হত্যা করে তালা ভেঙ্গে তাকবীর দেওয়া শুরু করেন। তাকবীর শোনার সাথে সাথে বাইরে অপেক্ষমান সৈন্যরা একযোগে ভেতরে প্রবেশ করে। নগরবাসী তখন ঘুমে অচেতন। এমন অতর্কিত হামলায় তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনাপতি হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} নিকট সন্ধির প্রস্তাব দেয় এবং নিজেদের হাতে নগর প্রাচীরের অন্য দ্বারগুলি উম্মুক্ত করে দেয়। একদিকে হযরত খালীদ {রাঃ} বিজয়ীর বেশে, অন্যদিকে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে নগরের অর্ধেক যুদ্ধ করে দখল করা হয়, তবুও হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} গোটা নগরবাসীর সাথে সন্ধির শর্তানুযায়ী সমান আচরণ করেন।-[রেফারেন্স : তারীখঃ ইবনুল আসীর ৬/৩২৯]
ফাহলের যুদ্ধেও হযরত খালীদ {রাঃ} অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রবর্তী বাহিনীর কম্যাণ্ডার। রোমানরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। ফাহলের পর হযরত খালীদ {রাঃ} ও হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} হিমসের দিকে অগ্রসর হন। দিমাশকের প্রশাসনিক দায়িত্বে তখন হযরত ইয়ায়িদ বিন আবু সুফিয়ান {রাঃ}। রোমানরা পুনরায় দিমাশক দখলের পায়তারা চালায়। হযরত ইয়াযিদ {রাঃ} বাধা দেন। প্রচণ্ড লড়াই চলছে। এমন সময় পেছনের দিক থেকে ধুমকেতুর মত হাজির হলেন হযরত খালীদ {রাঃ}। রোমান বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য ছাড়া সকলেই খালীদ-বাহিনীর হাতে নিহত হয়।
সিরিয়ার বিভিন্ন ফ্রন্টে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের খবর শুনে এক পর্যায়ে তথাকার রোমান শাসক মুসলমানদের সাথে শান্তি চুক্তির ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তার পরিষদবর্গ তাকে যুদ্ধের প্ররোচনা দিয়ে বলে,—“আমরা অবশ্যই আবু বাকারের অশ্বারোহীদের আমাদের ভূমিতে প্রবেশে বাধা দেব।”
তারা সেনাপতি মাহানের নেতৃত্বে ২ লাখ ৪০ হাজার সদস্যের এক বিরাট বাহিনী ইয়ারমুকে সমাবেশ করে। তাদের পাদ্ররী পুরোহিতরাও নির্জবাস থেকে বেরিয়ে ধর্মের নামে জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলে। খলীফা হযরত আবু বাকার {রাঃ} এ খবর শুনে মন্তব্য করেন,—“আল্লাহর কসম, আমি খালীদের দ্বারা তাদের প্রবৃত্তির এ প্ররোচনার নিরাময় করবো।”
‘হ্যাঁ, খালিদ ছিলেন সেদিন রোমানদের সেই মহাব্যাধির ধস্বস্তরী প্রতিষেধক।’
হযরত খালীদ {রাঃ} ময়দানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন কম্যাণ্ডার পৃথকভাবে নিজ নিজ সৈন্য পরিচালনা করছে। তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণ দেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হামদ-সানার পর বলেন,—“আজকের এ দিনটি আল্লাহর অন্যতম একটি দিন। এ দিনে গর্ব ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা উচিত নয়। তোমরা তোমাদের জিহাদে নিষ্ঠাবান হও, তোমাদের কাজের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা কর। এসো আমরা ইমারাহ বা নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে নিই। আমাদের কেউ আজ, কেউ আগামীকাল এবং কেউ পরশু আমীর হোক। এভাবে তোমাদের সকলেই আমীর হবে। তোমরা আজকের দিনটি আমাকে ছেড়ে দাও।”
সকলে প্রস্তাবে রাজি হলো।-[রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫]
তিনি গোটা বাহিনীকে মোট ৩৮/৩৬ টি ভাগে একজন অফিসার নিয়োগ করেন। সেদিন তিনি মুসলিম বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যাস করেন যে, আরবরা পূর্বে তেমন আর কখনো দেখেনি।
ইয়ারমুকে মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ অবস্থান গ্রহণের পর হযরত খালীদ {রাঃ} মহিলাদের আহবান জানান এবং প্রথম বারের মত তাদের হাতে তরবারি দিয়ে নির্দেশ দেন, তোমরা মুসলিম মুজাহিদদের পেছনে অবস্থান গ্রহণ করবে। কাউকে পালিয়ে পেছনে সরে আসতে দেখলে তাকে এ তরবারি দিয়ে হত্যা করবে।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫]
এই তোড়জোড়ের মধ্যে একজন মুসলিম মুজাহিদ হতাশ কন্ঠে বললো,—“রোমানদের সংখ্যা কত বেশী, আর আমাদের সংখ্যা কত কম।”
হযরত খালীদ {রাঃ} তাকে বললেন,—“তোমার কথা ঠিক নয়। বরং একথা বল, রোমানরা কত কম, এবং মুসলমানরা কত বেশী –মানুষের সংখ্যা দ্বারা নয়; বরং বিজয়ের দ্বারা সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পরাজয়ের দ্বারা হ্রাস পায়। আল্লাহর কসম, যদি আমার ঘোড়ার ক্ষুর ভালো থাকতো আমি তাদের এ আধিক্যের পরোয়া করতাম না।”-[রেফারেন্স : তারীখুল উম্মাহ আল –ইসলামিয়াহ ১/১৯৩]
উল্লেখ্য যে, র্দীঘ ভ্রমণে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর ঘোড়া ‘আসকার’–এর ক্ষুর আহত হয়ে পড়েছিল।
ইয়ারমুক যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে রোমান সেনাপতি ‘মাহান’ দূত মারফত জানালো যে, সে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সাথে সরাসরি কথা বলতে চায়। খালীদ {রাঃ} রাজি হলেন। দু’বাহিনীর মধ্যবর্তী ময়দানে দু’সেনাপতি মুখোমুখি হলেন। রোমান সেনাপতি খালিদকে বললো,—“আমরা জেনেছি, কঠোর শ্রম ও ক্ষুধা তোমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। তোমরা চাইলে তোমাদের প্রত্যেককে আমরা দশটি দীনার, এক প্রস্থ পোশাক ও কিছু খাদ্য দিতে পারি। বিনিময়ে তোমরা দেশে ফিরে যাবে। আগামী বছরও অনুরূপ জিনিস আমি তোমাদের কাছে পাঠাবো।”
রোমান সেনাপতির এ কথায় যে– অপমান প্রচ্ছন্ন ছিল হযরত খালীদ {রাঃ} তা অনুধাবন করলেন। তিনি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উপযুক্ত জবাবটা ছুঁড়ে মারলেন। বললেন,—“ক্ষুধা আমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে আনেনি– যেমনটি তোমরা বলেছো। তবে আমরা একটি রক্তপায়ী জাতি। আমরা জেনেছি, রোমানদের রক্ত অপেক্ষা অধিক লোভনীয় ও পবিত্র রক্ত নাকি পৃথিবীতে আর নেই। তাই সেই রক্তের লোভে আমরা এসেছি।”
কথাগুলি ছুঁড়ে দিয়েই মহাবীর হযরত খালীদ {রাঃ} ঘোড়ার লাগাম ধরে টান দিলেন এবং সোজা নিজ বাহিনীতে ফিরে এসে ‘আল্লাহু আকবর, হুয়্যি রিয়াহাল জান্নাহ’ –ধ্বনি দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।
রোমান বাহিনী এমন ভয়ংকররূপ অগ্রসর হলো যে, আরবরা এমনটি আর কখনো দেখেনি। মুসলিম বাহিনীর মধ্যভাগের দায়িত্বে ছিলেন হযরত ইকরিমা বিন আবী জাহিল {রাঃ} ও হযরত কাকা ইবন আমর {রাঃ}। ঝযরত খালীদ {রাঃ} তাঁদের আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। তাঁরা দু’জন কবিতার মতো পংক্তি আবৃত্তি করতে করতে শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলো। হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁর গোটা বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। হযরত খালীদ {রাঃ} রোমান অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর মধ্যভাগে ঢুকে পড়লেন। তিনি যেদিকে গেলেন, রোমান বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লো। একাধারে একদিন ও এক রাত তুমুল লড়াই চললো। পরদিন সকালে হযরত খালীদ {রাঃ}-কে দেখা গেল রোমান সেনাপতির মঞ্চের ওপর। তাবারীর মতে, এ যুদ্ধে রণক্ষেত্রে নিহতদের ছাড়াও পশ্চাৎদিকে পলায়নপর সৈনিকদের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার রোমান সৈন্য জর্দান নদীতে ডুবে মারা যায়।
যুদ্ধ শেষ। পরদিন সকালে হযরত ইকরিমা {রাঃ} ও তাঁর পুত্র হযরত আমর বিন ইকরিমা {রাঃ}-কে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল। হযরত খালীদ {রাঃ} হযরত ইকরিমা {রাঃ}-এর মাথা নিজের উরু ও হযরত আমর {রাঃ}-এর মাথা পায়ের নলার ওপর রেখে, তাঁদের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন এবং গলায় ফোঁটা ফোঁটা পানি ঢালতে ঢালতে বলতে লাগলেন,—“ ‘ইবনুল হানতামা’ অর্থাৎ উমার মনে করেছিলেন আমরা শাহাদাত বরণ করতে জানিনে। কক্ষণো নয়।” এ যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন।-[রেফারেন্স : তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ -১/১৯৩]
সাইফুল্লাহ্ হযরত খালীদ ইবনুল ওয়ালিদ {রাঃ}-এর ব্যক্তিত্ব রোমান বাহিনীকে কতটুকু প্রভাবিত করেছিল বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যায়। ইয়ারমুকের যুদ্ধ তখন চলছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রোমান বাহুনীর এক কম্যাণ্ডার, নাম ‘জারজাহ’ নিজ ছাউনী থেকে বেরিয়ে এল। তার উদ্দেশ্য হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সাথে সরাসরি কথা বলা। হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁকে সময় ও সুযোগ দিলেন। জারজাহ বললো,—“খালীদ, আমাকে একটি সত্যি কথা বলুন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মিথ্যা বলেন না। আল্লাহ কি আকাশ থেকে আপনাদের নবীকে এমন কোন তরবারী দান করেছেন যা তিনি আপনাকে দিয়েছেন এবং সেই তরবারি যাদেরই বিরুদ্ধে উত্তোলিত হয়েছে, তারা পরাজিত হয়েছে?”
হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন,—“ না।”
জারজাহ বললো,—“তাহলে আপনাকে ‘সাইফুল্লাহ’–আল্লাহর তরবারী বলা হয় কেন?” হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন,—“আল্লাহ আমাদের মাঝে তাঁর রাসূল পাঠালেন। আমাদের কেউ তাঁকে বিশ্বাস করলো, কেউ করলো না। প্রথমে আমি ছিলাম শেষোক্ত দলে। অতঃপর আল্লাহ আমার অন্তর ঘুরিয়ে দেন। আমি তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনে তাঁর হাতে বাইয়াত করি। রাসূল {ﷺ} আমার জন্য দু’আ করেন। আমাকে তিনি {ﷺ } বলেন,—“তুমি আল্লাহর একটি তরবারী” এভাবে আমি হলাম ‘সাইফুল্লাহ’।” জারজাহ বললো,—“কিসের দিকে আপনারা আহবান জানান?” হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন, —“আল্লাহর একত্ব ও ইসলামের দিকে।”
জারজাহ বললো,—“কিভাবে? আপনারা তো এগিয়ে আছেন।” হযরত খালীদ {রাঃ} বললেন, —“আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ} } সাথে উঠেছি, বসেছি। আমরা দেখেছি তাঁর {ﷺ} মা’জিযা ও অলৌকিক কর্মকাণ্ড। যা কিছু আমরা দেখেছি তা কেউ দেখলে, যা শুনেছি তা কেউ শুনলে, অবশ্যই তার উচিত সহজেই ইসলাম গ্রহণ করা। আর আপনারা যারা তাঁকে দেখেননি, তাঁর কথা শুনেননি, তারপরও অদৃশ্যের ওপর ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতিদান অধিকতর শ্রেষ্ঠ। যদি আপনারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন।” জারজাহ অশ্ব হাঁকিয়ে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,—খালীদ, আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।” জারজাহ ইসলাম গ্রহণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। এ দু’রাকাতই তার জীবনের প্রথম ও শেষ নামায। তারপর এ নওমুসলিম-রোমান শাহাদাতের বাসনা নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে চললেন রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। আল্লাহ পাক তার বাসনা পূর্ণ করলেন। তিনি শহীদ হলেন।-[রেফারেন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৯-৩০১]।
ইয়ারমুকে রোমান বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের খবর শুনে হিরাক্লিয়াস হিমস নগরী পেছনে ফেলে পিছু হটে যান। যাবার সময় তিনি বলেছিলেন –‘সালামুন আলাইকা ইয়া সুরিয়া সালামান লা লিকাআ বা’দাহ’ –হে সিরিয়া, তোমাকে বিদায়ী সালাম, যে সালামের পর আর কোন সাক্ষাৎ নেই। ইয়ারমুকের পর হযরত খালীদ {রাঃ} ‘হাদির’ জয় করেন।
হাদির অভিযান শেষ করে হযরত খালীদ {রাঃ} চললেন ‘কিন্নাসরীণ’ –এর দিকে। কিন্নাসরীনবাসীর
া আগে ভাগেই মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কিল্লায় প্রবেশ করে দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। হযরত খালিদ {রাঃ} তাদের লক্ষ্য করে বললেন,—“তোমরা যদি মেঘমালার ওপর আশ্রয় নাও আল্লাহ সেখানেও আমাকে উঠিয়ে নেবেন অথবা তোমাদের নামিয়ে নিয়ে আসবেন আমাদের কাছে।”-[রেফারেন্স : তারিখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ-২/৪] কিন্নাসরীণের অধিবাসীরা হিমসবাসীদের পরিণতি চিন্তা করে খালিদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে।
বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করা হয়েছে। এ অবরোধে মুসলিম বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসারদের মধ্যে হযরত খালীদ {রাঃ}ও আছেন। বাইতুল মুকাদ্দাসের খৃষ্টান অধিবাসীরা কোন দিশা না পেয়ে সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তারা আবদার রেখেছে স্বয়ং আমীরুল মুমিনীন উমার {রাঃ} নিজ হাতে সেই সন্ধিপত্রে সাক্ষর করবেন। তাদের আবদার রক্ষার জন্য খালিদ মাদীনা থেকে সিরিয়া এসেছেন। তিনি সিরিয়ায় অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর অফিসারবৃন্দকে ‘জাবিয়া’ তলব করেছেন। অত্যন্ত জাঁকজমক পোশাক পরে ঝযরত খালীদ {রাঃ} এসেছেন। খলীফার দৃষ্টিতে পড়তেই তিনি ঘোড়া থেকে নেমে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ করে বলেন,—“এত শিগগির অভ্যাস পাল্টে ফেলেছো?” হযরত খালীদ {রাঃ} হাতিয়ার উচু করে ধরে বললেন,—“তবে সৈনিক সুলভ অভ্যাস যায়নি।” খলীফা বললেন,—“তাহলে কোন দোষ নেই।” হিজরী ১৭ সনে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} ও হযরত খালীদ {রাঃ} যৌথভাবে হিমসের বিদ্রোহ দমন করেন। আর সেই সাথে সমগ্র সিরিয়ায় শত শত বছরের রোমান শাসনের অবসান ঘটে।
এতবড় সেনাপতিকেও খলীফা হযরত উমার {রাঃ} রেহাই দেননি। তিনি খালীদ {রাঃ}-কে সেনাপতির পদ থেকে সাধারণ সৈনিকের পদে নামিয়ে দেন। বরখাস্তের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য আছে। কারো মতে হযরত উমার {রাঃ}-এর খিলাফতের পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর হিজরী ১৭ সনে তাঁকে অপসারণ করা হয়। আবার কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত উমার {রাঃ} খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরই তাঁকে বরখাস্ত করেন, হযরত খালীদ {রাঃ} তখন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অপসারণের ঘটনা সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ বলেছেন, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে এ ধারণা ও বিশ্বাস জন্ম লাভ করে যে, ইসলামের বিজয় মূলতঃ হযরত খালীদ {রাঃ}-এর বাহুবলের ওপর নির্ভরশীল। এর কারণে আল্লাহর উপর থেকে মানুষের তাওয়াক্কুল কমতে শুরু করে। এ ধরনের অমূলক ধারণা খলীফা হযরত উমার {রাঃ} মোটেই মনোপূত ছিল না। তিনি হযরত খালীদ {রাঃ}-কে অপসারণ করে এ বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণ করেন।
হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} খলীফার এ ফরমান লাভ করেন ইয়ারমুকের রণক্ষেত্রে। ইয়ারমুকে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। এমন সময় মাদীনা থেকে নতুন খলীফা উমার {রাঃ}-এর দূত একটি চিঠি নিয়ে রণাঙ্গনে উপস্থিত হলো। চিঠির বিষয়বস্তু দুইটি– হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর মৃত্যু সংবাদ এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-কে অপসারণ করে তাঁর স্থলে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর নিয়োগ। হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} চিঠিটি পাঠ করে হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর জন্য মাগফিরাত ও হযরত উমার {রাঃ}-এর সাফল্য কামনা করে দু’আ করলেন। তারপর পত্রবাহককে অনুরোধ করলেন সে যেন পত্রের বিষয় কারো কাছে প্রকাশ না করে। এভাবে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর মৃত্যু সংবাদ ও হযরত উমার {রাঃ}-এর নির্দেশ গোপন করে সৈন্যদের মনবলক্ষুন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করেন এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-এর কমাণ্ড চালিয়ে অব্যশ্যম্ভাবী বিজয় ছিনিয়ে আনেন। অতঃপর হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর হযরত খালীদ {রাঃ}-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে খলীফার ফরমান পাঠ করে শোনান এবং সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্তের ইঙ্গিত হিসাবে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর মাথা থেকে টুপি নামিয়ে নেন এবং পাগড়ি ঘাড়ের ওপর নামিয়ে দেন। খালীদ {রাঃ} শুধু মন্তব্য করেন,—“আমি খলীফার ফরমান শুনেছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এখনও আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মানতে এবং খিদমাত অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।”
খলীফা তাঁকে মাদীনায় তলব করেন। তিনি মাদীনায় পৌঁছলে তাঁর সম্পদের কঠোর হিসাব গ্রহণ করা হয়; কিন্তু কোন অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। অতঃপর খলীফা উমার {রাঃ} সর্বত্র ঘোষণা করে দেন,—“আমি খালীদকে আস্থাহীনতা, ক্রোধবশতঃ বা এ জাতীয় কোন কারণে অপসারণ করিনি।-[ইবনুল আসীর-২/৪১৮]
উল্লেখিত ঘটনা ছাড়াও হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অপসারণের আরো কারণ ছিল। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সৈনিক স্বভাবে ছিল রুক্ষতা। প্রতিটি কাজে তিনি নিজের মর্জিমত চলতেন, খলীফার সাথে পরামর্শের প্রয়োজন মনে করতেন না। সেনাবাহিনীর আয়-ব্যয়ের হিসাবও খলীফার দরবারে নিয়ম মত পাঠাতেন না। ইরাক অভিযান শেষ করেই তিনি খলীফা হযরত আবু বাকার {রাঃ}-এর অনুমতি ছাড়াই হজ্জের উদ্দেশ্যে মাক্কায় চলে যান। তাঁর এ কাজে হযরত আবু বাকার {রাঃ} ভীষণ বিরক্ত হন। খলীফা তাঁকে বার বার সতর্ক করেন। তিনি খলীফাকে জবাব দেন,—“আমাকে আমার মর্জিমত কাজ করার সুযোগ দিন, অন্যথায় আমি নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবো। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর এসব কাজে আবু বাকার {রাঃ}-এর সময় থেকেই হযরত উমার {রাঃ} অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি বার বার আবু বাকার {রাঃ}-কে পরামর্শ দান করেন হযরত খালীদ {রাঃ}-কে বরখাস্ত করার জন্য। হযরত আবু বাকার {রাঃ} প্রতিবারই জবাব দেন,—“আমি এমন তরবারীকে কোষবদ্ধ করতে পারিনা যাকে স্বয়ং আল্লাহ কোষমুক্ত করেছেন।”
হযরত উমার {রাঃ} খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর হযরত খালীদ {রাঃ}-কে সংশোধনের চেষ্টা করেন; কিন্তু ফলোদয় না হওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করেন।
বিষয়টি যেভাবে এবং যেমন করেই ঘটুক না কেন, এ ক্ষেত্রে হযরত খালিদের ভূমিকা লক্ষ্যণীয় বিষয়। তিনি যে আনুগত্য নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ইতিহাসে তার কোন নজীর পাওয়া যাবে না। এমনটি করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন এ কারণে যে, তিনি বিশ্বাস করতেন সেনাপতি ও সাধারণ সৈনিক –উভয় অবস্থা সমান। সর্ব অবস্থায় আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল {ﷺ} এবং যে দ্বীনের প্রতি তিনি ঈমান এনেছেন, তাদের সকলের প্রতি দায়িত্ব পালন করা নিজের অপরিহার্য কর্তব্য বলে মনে করতেন। একজন অনুগত সেনাপতি এবং একজন অনুগত সাধারণ সৈনিক– এ দু’য়ের মধ্যে মূলতঃ কোন প্রভেদ তাঁর দৃষ্টিতে ছিল না। তাই তিনি সেনাপতির পদ ছেড়ে সাধারণ সৈনিক হিসেবে সমানভাবে কাজ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। আর একই কারণে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর হাতে সেনাপতির দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার পর সাধারণ সৈনিকের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি বলতে পেরেছিলেন,—“এই উম্মাতের আমীন বা পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি আবু উবাইদাকে তোমাদের আমীর নিয়োগ করা হয়েছে।”
খলীফা হযরত উমার {রাঃ} হযরত খালীদ {রাঃ}-কে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করার পর তাঁকে বিভিন্ন প্রদেশে ওয়ালী ও গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন। হযরত খালীদ {রাঃ} এসময় তার কর্মজীবনের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌছান। তিনি খ্যাত হয়ে উঠেন এবং মুসলিমদের কাছে তিনি জাতীয় বীর গণ্য হতেন। জনসাধারণ তাকে সাইফউল্লাহ ("আল্লাহর তলোয়ার") বলে ডাকত। হযরত খালীদ {রাঃ} ‘মারাশ’ অধিকার করার কিছুকাল পর জানতে পারেন যে খ্যাতনামা কবি আশ’আস হযরত খালীদ {রাঃ}-এর প্রশংসা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। হযরত খালীদ {রাঃ} তাকে ১০,০০০ দিরহাম উপহার হিসেবে দেন।
খলীফা হযরত উমার {রাঃ} এই ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হিসেবে বিবেচনা করেন। হযরত উমার {রাঃ} হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-কে চিঠি লিখে আশ’আসকে দেয়া হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অর্থের উৎস বের করার নির্দেশ দেন। বলা হয়েছিল যে,—“যদি খালীদ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দেন তবে তা ক্ষমতার অপব্যবহার। আর যদি তিনি নিজের অর্থ প্রদান করেন তবে তা অপচয়। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন।” হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-কে একাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} হযরত খালীদ =রাঃ}-এর গুণগ্রাহী ছিলেন এবং ছোট ভাইয়ের মত স্নেহ করতেন। ফলে এই দায়িত্ব পালন তার জন্য কঠিন ছিল। এর পরিবর্তে তিনি বিলাল ইবনে রাবাহকে এই দায়িত্ব দেন এবং হযরত খালীদ {রাঃ}-কে চেলসিস থেকে এমেসায় তলব করেন। হযরত খালীদ {রাঃ} বলেন যে তিনি নিজের অর্থ থেকে এই উপহার দিয়েছেন। তিনি হযরত আবু উবাইদা {রাঃ}-এর কাছে উপস্থিত হলে হযরত আবু উবাইদা {রাঃ} তাকে জানান যে হযরত উমার {রাঃ}-এর নির্দেশে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে হযরত খালীদের {রাঃ} সামরিক জীবনের ইতি ঘটে এবং তিনি হেমসে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন।
বাহ্যিকভাবে খলীফা উমার {রাঃ} ও হযরত খালীদ {রাঃ}-এর সম্পর্ক শীতল হলেও তারা একে অন্যের প্রতি খারাপ মনোভাব পোষণ করতেন না। মৃত্যুর আগে হযরত খালীদ {রাঃ} তার সম্পদ হযরত উমার {রাঃ}-এর হাতে অর্পণ করে যান এবং হযরত উমার {রাঃ}-কে নিজ অসিয়তের বাস্তবায়নকারী মনোনীত করেছিলেন।
পদচ্যুতির চার বছর পর ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দের হিজরী ২১/২২ সনে কিছু দিন অসুস্থ থাকার পর হযরত খালীদ {রাঃ} ইন্তেকাল করেন। সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর থেকে তিনি সেখানে বসবাস করছিলেন। তার মাজার শরীফ বর্তমানে খালীদ বিন ওয়ালীদ মসজিদের অংশ। হযরত খালীদ {রাঃ}-এর কবরফলকে তার নেতৃত্বাধীনে জয় হওয়া ৫০টি যুদ্ধের নাম (ছোট যুদ্ধ ব্যতীত) উৎকীর্ণ রয়েছে। তিনি যুদ্ধে শাহীদ হতে ইচ্ছুক ছিলেন তাই বাড়িতে মৃত্যুর পূর্বে তিনি বিমর্ষ হয়ে যান।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি বেদনা নিয়ে বলেন,
—“আমি শাহাদাতের ইচ্ছা নিয়ে এত বেশি যুদ্ধে লড়াই করেছি যে আমার শরীরের কোনো অংশ ক্ষতচিহ্নবিহীন নেই যা বর্শা বা তলোয়ারের কারণে হয় নি। এরপরেও আমি এখানে, বিছানায় পড়ে একটি বৃদ্ধ উটের মতো মারা যাচ্ছি। কাপুরুষদের চোখ যাতে কখনো শান্তি না পায়।”
হযরত আবু বাকার {রাঃ} তার সম্পর্কে বলতেন,—“আর কোনো নারী কোনদিন খালীদের মত সন্তান গর্ভে ধারণ করবে না।” হযরত খালীদ {রাঃ}-এর মৃত্যুর পর খলীফা হযরত উমার {রাঃ} বলেছিলেন,—“নারীরা খালীদের মত সন্তান প্রসবে অক্ষম হয়ে গেছে।” হযরত খালীদ {রাঃ}-এর মৃত্যুর পর খলীফা অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে কেঁদেছিলেন। মানুষ পরে জেনেছিল, শুধু হযরত খালিদের {রাঃ}-এর বিয়োগ ব্যথায় তিনি এভাবে কাঁদেননি; বরং হযরত খালীদ {রাঃ}-এর অপসারণের কারণ দূরীভূত হওয়ায় তিনি তাঁকে আবার সেনাপতির পদে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। মৃত্যু তাঁর সেই ইচ্ছার প্রতিবন্ধক হওয়ায় তিনি এত কেঁদেছিলেন।-[রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫]
প্রথম থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত হযরত খালীদ {রাঃ}-এর জিহাদের ময়দানে অতিবাহিত হয়েছে। এ কারণে হযরত রাসূলে পাকের {ﷺ} সুহবতে থাকার সুযোগ ও সময় খুব কম পেয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেন,—“জিহাদের ব্যস্ততা কুরআনের বিরাট একটি অংশ শিক্ষা থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছে।”-[আল ইসাবা-১/৪১৫]
তা সত্বেও সুহবতে নববীর ফয়েজ ও ইলমের সৌভাগ্য থেকে তিনি বঞ্চিত ছিলেন, তা নয়। রাসূলে পাকের {ﷺ} ইনতিকালের পর মাদীনার আলিম ও মুফতি সাহাবীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। তবে সৈনিক স্বভাবের কারণে ইফতা’র মসনদে কখনো তিনি বসেননি। তাঁর ফতোয়ার সংখ্যা দু’চারটির বেশী পাওয়া যায় না।-[আ’লামুল মুওয়াক্কিয়ীন] তিনি মোট ১৮টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে দু’টি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম এবং একটি বুখারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
একবার হযরত আম্মার বিন ইয়াসির {রাঃ} ও তাঁর মধ্যে ঝগড়া হয়। হযরত খালীদ {রাঃ} তাঁকে ভীষণ গালমন্দ করেন। হযরত আম্মার {রাঃ}ও রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর নিকট শিকায়েত করেন। সকল বৃত্তান্ত শুনে রাসূল{ ﷺ} মন্তব্য করেন,—“যে আম্মারের সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে সে আল্লাহর সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে।”
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর ওপর রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} এ বাণীর এমন প্রতিক্রিয়া হলো যে, তিনি তক্ষুণি হযরত আম্মার {রাঃ}-এর কাছে ছুটে যান এবং তাঁকে খুশী করেন। হযরত খালীদ {রাঃ} নিজেই বলেছেন,—“রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর নিকট থেকে ওঠার পর আম্মারের সন্তুষ্টি অর্জন করা ছাড়া আমার নিকট অধিক প্রিয় আর কোন জিনিস ছিল না।”
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর হৃদয়ে রাসূলে পাক {ﷺ} -এর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা এত তীব্র ছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর শানে কেউ কোন সামান্য অমার্জিত কথা বললে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। একবার রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} -এর নিকট কিছু স্বর্ণ এলো। তিনি তা নজদী সরদারদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। কুরাইশ ও আনসারদের কেউ কেউ এতে আপত্তি জানায়। এক ব্যক্তি বলে বসে,—“মুহাম্মাদ আল্লাহকে ভয় করুন।” রাসূল{ ﷺ } বললেন, —“আমি আল্লাহর নাফরমানী করলে আল্লাহর ইতায়াত বা আনুগত্য করে কে?” লোকটির এমন অমার্জিত কথায় হযরত খালীদ {রাঃ} ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন,—“ইয়া রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ} ,অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই।” রাসূল (সা) তাঁকে শান্ত করেন।”-[রেফারেন্স : বুখারী শারীফ]
হযরত খালীদ {রাঃ}-এর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও গৌরবজনক অধ্যায় ‘জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ’–আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। জীবনের বেশীর ভাগ সময় তাঁর রণক্ষেত্রে কেটেছে। তাঁর বীরত্বব্যঞ্জক কর্মকাণ্ড ও জিহাদের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কারণে হযরত রাসূলে পাক {ﷺ} -এর পক্ষ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। প্রায় ১৫০ মতান্তরে সোয়া শো যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। যেখানেই গেছেন বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন। তাঁর ওপর হযরত রাসূলে পাক {ﷺ} -এর এতখানি আস্থা ছিল যে, তাঁর হাতে পতাকা এলে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে যেতেন। প্রচুর সমরাস্ত্র তিনি পৈতৃক বিষয় হিসেবে লাভ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সব কিছুই আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দেন। (তাবাকাত) তাঁর বন্ধু ও শত্রুরা তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছে,—“তিনি এমন ব্যক্তি যিনি নিজেও ঘুমান না, অন্যকেও ঘুমাতে দেন না।”
হযরত খালীদ {রাঃ} নিজেই বলতেন,—“এমন একটি রাত্রি যা আমি নব বধুর সাথে কাটাতে পারি, অথবা যে রাত্রে আমাকে একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়– তা অপেক্ষা একটি প্রচণ্ড শীতের রাত্রে একটি মুহাজির দলের সাথে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালাই, তা আমার নিকট অধিক প্রিয়।”
মৃত্যুশয্যায় একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন,—“আমি শতাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, আমার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তরবারী, তীর অথবা বর্শার দু’একটি আঘাত রয়েছে। আর আজ আমি জ্বরাগ্রস্ত উটের মত বিছানায় পা দাপিয়ে মৃত্যুবরণ করছি।” কথাগুলি তিনি যখন বলছিলেন তখন তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল।-[রেফারে
ন্স : রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫-৩০৬, উসুদুল গাবা-২/৯৫]
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি খলীফা হযরত উমার {রাঃ}-এর অনুকূলে অসীয়াত করে যান। সেই পরিত্যক্ত সম্পত্তি তাঁর ঘোড়াটি ও কিছু যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবে জীবদ্দশায় তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তু-দু’টি মরণের পরও আল্লাহর রাস্তায় অয়াকফ করে যান।
হযরত রাসূলে কারীম {ﷺ} নানা প্রসঙ্গে একাধিকবার তাঁর প্রশংসা করেছেন। মাক্কাহ্ বিজয়ের সময় একদিন কিছু দূরে হযরত খালীদ {রাঃ}-কে দেখা গেল। রাসূল{ ﷺ} আবু হুরাইরা {রাঃ}-কে বললেন,—“দেখোতো কে?”
তিনি বললেন,—“খালিদ।” রাসূল{ ﷺ} বললেন,—“আল্লাহর এ বান্দাটি কতই না ভালো।”
একবার রাসূল{ ﷺ} সাহাবীদের বলেন,—“খালীদকে তোমরা কষ্ট দেবে না। কারণ, সে কাফিরদের বিরুদ্ধে চালিত আল্লাহর তরবারি।”
একবার রাসূল{ ﷺ} হযরত উমার {রাঃ}-কে পাঠালেন যাকাত আদায়ের জন্য। ইবনে জামীল, হযরত খালীদ {রাঃ} ও হযরত আব্বাস {রাঃ} –এ তিনজন যাকাত দিতে অস্বীকার করলো। রাসূল{ ﷺ} একথা অবগত হয়ে বললেন,—“ইবনে জামীল ছিল দরিদ্র, আল্লাহ তাকে সম্পদশালী করেছেন। এ তার প্রতিদান। তবে খালীদের প্রতি তোমরা বাড়াবাড়ি করেছো। সে তার সকল যুদ্ধাস্ত্র আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছে। তার ওপর যাকাত হয় কেমন করে? আর আব্বাস? তার দায়িত্ব আমার ওপর। তোমাদের কি জানা নেই চাচা পিতৃস্থানীয়?-[রেফারেন্স : আবু দাউদ-১/১৬৩]
হযরত খালীদ {রাঃ} কেবল একজন সৈনিকই ছিলেন না, তিনি একজন দক্ষ দা’য়ী-ই-ইসলাম–ইসলামের দাওয়াত দানকারীও ছিলেন। বনী জুজাইমা ও মালিক ইবন নুওয়াইরার ব্যাপারে তরিৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে যে ক্ষতি হয় তা লক্ষ্য করে রাসূল{ ﷺ } পরর্তীতে দায়িত্ব দিয়ে কোথাও পাঠানোর সময় তাঁকে উপদেশ দেন,—“শুধু ইসলামের দাওয়াত দেবে, তলোয়ার ওঠাবে না।”
তেমনিভাবে ইয়ামনে পাঠানোর সময়ও নির্দেশ দেন,—“যুদ্ধের সূচনা যেন তোমার পক্ষ থেকে না হয়।” এ হিদায়াত লাভের পর যত যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন কোথাও কোন প্রকার বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে জানা যায় না। রাসূলুল্লাহ্ {ﷺ } -এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পরেও তিনি যথাযথভাবে দা’য়ীর দায়িত্ব পালন করেছেন। মাক্কাহ্ বিজয়ের পর রাসূল{ ﷺ} ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য চতুর্দিকে যে বিভিন্ন মিশন পাঠান, তার কয়েকটির দায়িত্ব হযরত খালীদ {রাঃ} পালন করেন। বনী যুজাইমা ও বনী আবদিল মাদ্দান তাঁরই চেষ্টায় ইসলাম গ্রহন করে। ইয়ামনের দাওয়াতী কাজে তিনি হযরত আলী {রাঃ}-এরসহযোগী ছিলেন। তাঁরই চেষ্টায় ভণ্ড নবী তুলাইহা আসাদীর সহযোগী বনী হাওয়াযিন, বনী সুলাইম, বনী আমের প্রভৃতি গোত্র পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে। এছাড়াও অসংখ্য লোক বিভিন্ন সময় তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করে। প্রতিটি যুদ্ধ শুরুর আগে ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষকে সব সময় তিনি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে প্রচণ্ড যুদ্ধের মাঝেও তিনি সফল দায়ীর ভূমিকা পালিন করেছেন। ইয়ারমুকের রোমান সৈনিক ‘জারজাহ’ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
সংক্ষিপ্ত কোন প্রবন্ধে হযরত খালীদ {রাঃ}-এর জীবনের সব কথা তুলে ধরা যাবে না। আমীরুল মু’মিনীন উমার {রাঃ} খালীদ {রাঃ}-এর মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে যে –কথাগুলি বলেছিলেন, আমিও সেই কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করছি, “রাহেমাল্লাহ আবা সুলাইমান, মাইনদাল্লাহ খায়রুন মিম্মা কানা ফীহিল্লা, লাকাদ আশা হামীদান ওয়া মাতা সা’ঈদান”– আল্লাহ আবু সুলাইমান খালিদের ওপর রহম করুন। তিনি যে অবস্থায় ছিলেন আল্লাহর কাছে তার থেকে উত্তম কিছু নেই। তিনি জীবনে প্রশংসিত এবং মরণে সৌভাগ্যবান।-[রেফারেন্স : +রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৮]
হুব্বে সাহাবা জিন্দাবাদ...
বুগযে সাহাবা মুরদাবাদ...
No comments:
Post a Comment